ইসরাইল, গাজা, যুক্তরাষ্ট্র,

অবশেষে ইসরাইলের রক্ষকরাও সত্য স্বীকার করতে শুরু করেছেন

ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত এক মতামত প্রবন্ধে গবেষক ও লেখক শাদি হামিদ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি যুদ্ধ ঘিরে পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসরে কথাবার্তার দ্রুত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এমনকি ইসরাইলের কিছু সুপরিচিত রক্ষকেরা যে স্বীকারোক্তি দিতে শুরু করেছেন, তা আন্তর্জাতিক জনমতের গতিপথে একটি উল্লেখযোগ্য বাঁক রচনা করেছে।

হামিদ লিখেছেন, বাস্তবতার নিরিখে কিছু পরিবর্তন সত্যিই দৃশ্যমান। গাজার অনাহারক্লিষ্ট শিশুদের হৃদয়বিদারক চিত্র এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো দীর্ঘদিনের ইসরাইলপন্থী নেতাদের মনেও আলোড়ন তুলেছে। এই চাপ বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ইসরাইলকে ঘিরে পশ্চিমা সমর্থনের ইতিহাসে বিরল।

ইসরাইলি আখ্যানের ভাঙন

প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন, যেখানে তিনি গাজায় দুর্ভিক্ষের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। ট্রাম্প স্বীকার করেন, “এটা একটি বাস্তব দুর্ভিক্ষ, যা অস্বীকার করা যায় না।” তিনি আরও জানিয়েছেন, গাজায় খাদ্য সহায়তা বিতরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয়দের সঙ্গে একত্রে কাজ করবে।

হামিদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রে অতি-ডানপন্থী মহলে অবস্থান পরিবর্তনের লক্ষণ। রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেলর গ্রিন প্রথম গাজার পরিস্থিতিকে প্রকাশ্যে “গণহত্যা” হিসেবে অভিহিত করেন। অন্যদিকে, ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন স্বীকার করেছেন যে, এমনকি MAGA আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যেও—বিশেষ করে ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণদের মধ্যে—ইসরাইলের প্রতি সমর্থন কমে এসেছে।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো বলছে, ৫০ শতাংশ তরুণ রিপাবলিকান এখন ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, যেখানে ২০২২ সালে এই হার ছিল ৩৫ শতাংশ।

যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তা

প্রবন্ধে হামিদ জোর দিয়ে বলেছেন, এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আরও মানবিক বিপর্যয় রোধ করা। একমাত্র কার্যকর উপায় হলো একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো এবং ইতোমধ্যে ৬০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণহানির অবসান ঘটানো।

তিনি উল্লেখ করেছেন, এমনকি কট্টর ইসরাইলপন্থী সাংবাদিক হাভিভ রেটিগ-গুর ও অমিত সেগাল গাজায় “প্রকৃত খাদ্য সংকট”-এর কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন—যা দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকার করে আসা ইসরাইলি বর্ণনার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।

বিলম্বিত, তবে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি

তবে, লেখক মনে করেন যে এই বিলম্বিত স্বীকারোক্তিগুলো সংশ্লিষ্টদের নৈতিক দায় থেকে মুক্ত করে না। তিনি স্বীকার করেন, ফিলিস্তিনি জনগণ এবং তাদের সমর্থকদের অনেকেই এই নতুন সমালোচকদের প্রতি ক্ষুব্ধ, কারণ তারা তখনই মুখ খুলছেন যখন বহু প্রাণ ইতোমধ্যে ঝরে গেছে।

তবুও, হামিদ ফিলিস্তিন সংহতি আন্দোলনের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানিয়েছেন এক “বিস্তৃত তাঁবু” রচনার—যেখানে এমন লোকদেরও জায়গা দেওয়া হবে, যারা পূর্বে হয়তো নীরব ছিলেন বা এমনকি সহযোগী ভূমিকায় ছিলেন, কিন্তু এখন সত্যের মুখোমুখি হয়ে তাঁদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছেন।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, এই যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পেছনে এখন একমাত্র চালিকা শক্তি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক স্বার্থ। কৌশলগত বা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে আর কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ অবশিষ্ট নেই। বরং যুদ্ধের রাজনৈতিক শোষণই অপ্রয়োজনীয় ধ্বংস ও ব্যাপক মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠেছে।

ওয়াশিংটনের হাতে যুদ্ধ বন্ধের চাবিকাঠি

প্রবন্ধটি উপসংহারে বলেছে, যুদ্ধ থামানোর মূল চাবিকাঠি এখনো ওয়াশিংটনের হাতেই রয়ে গেছে। কিন্তু পরপর কয়েকটি মার্কিন প্রশাসন সেই ক্ষমতা প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লেখক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে একমাত্র আশা হয়তো ট্রাম্পের “আবেগনির্ভর ও অপ্রত্যাশিত আচরণ”-এর ওপরই নির্ভর করতে পারে—যা শান্তিপ্রিয়দের জন্য এক রকম অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ন্যায়বিচার কখনও নিজে নিজে আসে না। এটি অর্জনের জন্য প্রয়োজন টেকসই প্রয়াস এবং সাহসিকতা। বিশেষত, যদি ট্রাম্প সত্যিই এই যুদ্ধ থামাতে সক্ষম হন, তবে “আমাদের অবশ্যই আমাদের অহঙ্কার গিলতে হবে, সন্দেহ দমন করতে হবে, এবং প্রার্থনা করতে হবে যেন ক্ষুধার্ত শিশুদের প্রতি তার আবেগপূর্ণ প্রতিক্রিয়া কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।”

সূত্র : দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top