আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) লক্ষ্য করে নতুন দফা নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরাইলি নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিকারী আদালতের বিরুদ্ধে এটি চাপ প্রয়োগের সর্বশেষ উদাহরণ।
বুধবার এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অনুমোদনে আইসিসির সদস্যদের তালিকায় নতুন করে দুই বিচারক ও দুই প্রসিকিউটরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ‘এই আদালত একটি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের বিরুদ্ধে আইনের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
আইসিসির প্রতিক্রিয়া
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ঘোষণার পর আইসিসি জানায়, নিষেধাজ্ঞাগুলি ‘একটি নিরপেক্ষ বিচারিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট আক্রমণ’ এবং যুদ্ধাপরাধের শিকারদের প্রতি নিন্দা। আদালত আরও জানায়, তারা ‘কোনও নিষেধাজ্ঞা, চাপ বা হুমকির তোয়াক্কা না করে’ তাদের কাজ চালিয়ে যাবে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা কর্মকর্তারা
নতুন নিষেধাজ্ঞায় লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন—
কানাডার কিম্বার্লি প্রোস্ট,
ফ্রান্সের নিকোলাস গুইলো,
ফিজির নাজাত শামীম খান,
সেনেগালের মামে মান্ডিয়ায়ে নিয়াং।
গুইলো ছিলেন সেই প্রাক-বিচার প্যানেলের তত্ত্বাবধায়ক বিচারক, যা ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। খান ও নিয়াং আদালতের দুই ডেপুটি প্রসিকিউটর, যাদের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। অন্যদিকে, প্রোস্টকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে আফগানিস্তানে মার্কিন কর্মীদের বিরুদ্ধে আইসিসির তদন্ত অনুমোদনের রায় দেওয়ার কারণে।
নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু রুবিওর এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটি ‘ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ।’
আইসিসি পূর্বে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু এবং প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। একইসাথে, আদালত আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের তদন্তও শুরু করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র চাপের পর আদালত জানায়, তারা তালেবান ও আইএসআইএল কর্তৃক নির্যাতনকে অগ্রাধিকার দেবে।
যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল কেউই আইসিসির সদস্য নয়। তবে আদালতের দাবি, অপরাধ যেখানে সংঘটিত হয়েছে, সেই স্থান আদালতের সদস্য রাষ্ট্র হলে সেখানকার নাগরিকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে আইসিসির সমালোচক। নিজেদের কর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচার হতে পারে—এই আশঙ্কাই মূলত তাদের বিরোধিতার কারণ। তবে পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলো এতদূর এগোয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনই প্রথম আইসিসির কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বুধবার যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, তাদের মধ্যে দুজন ফ্রান্স ও কানাডার নাগরিক। এই দুই দেশ সম্প্রতি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা গাজায় ইসরাইলি নির্যাতন ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি উচ্ছেদের প্রেক্ষাপটে নেওয়া পদক্ষেপ।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিচারকদের ভূমিকাকে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দায়মুক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং এটি প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের কার্যকারিতায় গুরুতর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
সূত্র : আল জাজিরা




