ইসলামী শারিয়াহ মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক লেনদেনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। হালাল উপার্জন ও হারাম থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলিমদের জন্য অপরিহার্য। শরীয়তে এ বিষয়ে নির্ধারিত নীতিমালা রয়েছে। এই নীতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য শারিয়াহ স্ক্রিনিং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া।
লেনদেনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে শারিয়াহ স্ক্রিনিং কেন প্রয়োজন, তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-
১. ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে বিনিয়োগে শারিয়াহ স্ক্রিনিং : প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদ (রিবা) একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মুসলিমদের জন্য সুদভিত্তিক লেনদেন থেকে বিরত থাকা ফরয। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণরূপে ইসলামী নীতি মেনে চলছে কিনা তা যাচাই করা হয়।
২. পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে শারিয়াহ স্ক্রিনিং : শেয়ারবাজার, বন্ড মার্কেট এবং অন্যান্য বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মে এমন অনেক কোম্পানি থাকতে পারে, যারা হারাম কার্যক্রমে (যেমন মদ, জুয়া, পর্ণোগ্রাফি) জড়িত অথবা তাদের আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সুদ থেকে আসে। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে যাচাই করা হয়ে থাকে যে বিনিয়োগকৃত কোম্পানিগুলো শারিয়াহসম্মত মানদণ্ড পূরণ করে কিনা ! এক্ষেত্রে কোম্পানির কার্যক্রম, আয়ের উৎস, ঋণ অনুপাত এবং লিকুইড মানির অনুপাত ও অন্যান্য সকল কার্যক্রম শারিয়ার আলোকে বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
৩. বীমা খাত (তাকাফুল) : প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় সুদ, জুয়া (কিমার) এবং অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা (গারার) এর উপাদান বিদ্যমান থাকে, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। তাকাফুল ব্যবস্থা পারস্পরিক সহযোগিতা, দান এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির নীতির উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যেখানে এই হারাম উপাদানগুলো থেকে মুক্ত থাকা হয়। শারিয়াহ স্ক্রিনিং তাকাফুল প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম যাচাই করে নিশ্চিত করে যে তাদের শারিয়াহসম্মতভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, এক্ষেত্রে চুক্তির প্রকৃতি, তহবিল ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ নীতি এবং দাবি নিষ্পত্তি ও সমগ্রিক বিষয়গুলো শারিয়াহর আলোকে বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
৪. রিয়েল এস্টেট ও আবাসন : আবাসন ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত সুদভিত্তিক মর্টগেজ বা ঋণ ইসলামে নিষিদ্ধ। ইসলামী অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলো মুরাবাহা, ইজারা, মুশারাকা বা মুদারাবার মতো শারিয়াহসম্মত পদ্ধতির মাধ্যমে আবাসন অর্থায়ন করে, যা সুদ থেকে মুক্ত। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে এই অর্থায়ন পদ্ধতিগুলো সম্পূর্ণরূপে ইসলামী নীতি মেনে চলছে কিনা তা যাচাই করা হয়, এর পাশাপাশি অর্থায়ন চুক্তির ধরন, সম্পত্তির মালিকানা ও হস্তান্তর এবং ভাড়া চুক্তিসহ সামগ্রিক বিজনেস মডেল শারিয়ার আলোকে বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
৫. ব্যবসা ও বাণিজ্য : পণ্য ক্রয়-বিক্রয়, উৎপাদন এবং বিতরণ প্রক্রিয়ায় সুদভিত্তিক অর্থায়ন বা লেনদেন থেকে বিরত থাকা জরুরী। ইসলামে ব্যবসায়িক নৈতিকতা, সততা এবং স্বচ্ছতার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রমগুলো হারাম পণ্য বা সেবা উৎপাদন, সুদভিত্তিক লেনদেন, মজুদদারি, প্রতারণা এবং অন্যান্য অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে মুক্ত আছে কিনা, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং মুনাফা অর্জন পদ্ধতি ও ব্যাবসায়িক সকল কার্যক্রম শারিয়ার আলোকে সঠিক আছে কিনা তা বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
৬. ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক অর্থায়ন : দরিদ্র ও অভাবীদের সহায়তা করার জন্য প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় প্রায়ই উচ্চ সুদের হার জড়িত থাকে, যা তাদের ঋণের জালে আবদ্ধ করে। ইসলামে সুদবিহীন ঋণ (কার্দ হাসানা) এবং লাভ-লোকসান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অর্থায়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে, ক্ষুদ্রঋণ এবং সামাজিক অর্থায়ন প্রকল্পগুলো সুদবিহীন এবং লাভ-লোকসান ভাগাভাগির নীতির উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, , লাভ-লোকসান অংশীদারিত্ব এবং অর্থায়নের উদ্দেশ্য এবং সামগ্রিক দিকগুলো শারিয়ার আলোকে বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
৭. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত : শিক্ষা ঋণ বা স্বাস্থ্য বীমার ক্ষেত্রে সুদভিত্তিক লেনদেন মানুষকে এই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে অথবা তাদের উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপাতে পারে। ইসলামী স্কলারগণ এই খাতে সুদবিহীন অর্থায়ন এবং তাকাফুল ভিত্তিক স্বাস্থ্য বীমার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রদত্ত আর্থিক সহায়তা বা বীমা ব্যবস্থা শারিয়াহসম্মত এবং সুদ ও অন্যান্য হারাম উপাদান থেকে মুক্ত কিনা তা যাচাই করে দেখা হয়।
৮. ওয়ারিশ বন্টন ও উত্তরাধিকার : ইসলামে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বন্টনের সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে, যা কুরআন ও হাদিসে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই বিধানগুলো মেনে চলা মুসলিমদের জন্য ফরয। ওয়ারিশ বন্টনে শারিয়াহর বিধান অনুসরণ না করলে তা অন্যায় ও জুলুমের কারণ হতে পারে, যা পারিবারিক কলহ সৃষ্টি করে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি তার বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সঠিকভাবে এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে বন্টন করা হচ্ছে কি না সে বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা হয়
৯. যাকাত ও সাদাকাহ ব্যবস্থাপনা : যাকাত ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ এবং এর সংগ্রহ ও বন্টন শারিয়াহ অনুযায়ী হওয়া আবশ্যক। সাদাকাহ বা দানও শারিয়াহসম্মত উপায়ে পরিচালিত হওয়া উচিত। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا” (সূরা আত-তওবা, ৯:১০৩) অর্থাৎ, “তাদের সম্পদ থেকে সাদাকাহ গ্রহণ করুন, যার দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং পরিমার্জন করবেন। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে এক্ষেত্রে, যাকাত ও সাদাকাহর অর্থ হারাম উৎস থেকে আসছে কিনা, এবং তা শারিয়াহসম্মত খাতে ব্যয় হয় হচ্ছে কিনা । এক্ষেত্রে অর্থের উৎস, ব্যয়ের খাত, প্রাপক চিহ্নিতকরণ এবং বন্টন প্রক্রিয়া সামগ্রিক বিষয় শারিয়ার আলোকে বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
১০. হালাল পর্যটন ও আতিথেয়তা: মুসলিম পর্যটকদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে তারা শারিয়াহসম্মতভাবে ভ্রমণ ও অবস্থান করতে পারে। প্রচলিত পর্যটন শিল্পে এমন অনেক বিষয় থাকতে পারে যা ইসলামী মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক, যেমন হারাম খাদ্য, মদ পরিবেশন, অনৈতিক বিনোদন ইত্যাদি। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং পর্যটন পরিষেবা প্রদানকারীদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে তারা হালাল খাদ্য, শারিয়াহসম্মত আবাসন এবং বিনোদনের ব্যবস্থা মেনে চলছে কি না বিনোদনের ধরন, নামাজের সুবিধা এবং নারী-পুরুষের পৃথকীকরণ ও সকল কর্যক্রম শারিয়ার আলোকে বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
১১. হালাল খাদ্য ও পানীয় শিল্প: মুসলিমদের জন্য হালাল খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা ফরয। খাদ্য ও পানীয় উৎপাদন থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে শারিয়াহর বিধান মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যগুলো হালাল উৎস থেকে এসেছে কি না , প্রক্রিয়াকরণে কোনো হারাম উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে কি না , এবং সংরক্ষণ ও বিতরণে শারিয়াহসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না কাঁচামালের উৎস, প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি, সংযোজনীয় উপাদান, সংরক্ষণ ও পরিবহন এবং সম্পূর্ন প্রক্রিয়া বিশেষভাবে যাচাই করা হয়
১২. পোশাক ও প্রসাধনী শিল্প: মুসলিমদের জন্য হালাল পোশাক ও প্রসাধনী ব্যবহার করা জরুরি। পোশাক ও প্রসাধনী উৎপাদনে হারাম উপাদান (যেমন অ্যালকোহল, শুকরের চর্বি) ব্যবহার করা ইসলামে নিষিদ্ধ। পোশাকের ক্ষেত্রে শারিয়াহসম্মত শালীনতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে এই পণ্যগুলো উৎপাদনে কোনো হারাম উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, পোশাকের ডিজাইন শারিয়াহসম্মত শালীনতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কি না,
উপাদানের উৎস, উৎপাদন প্রক্রিয়া, পোশাকের ডিজাইন ও শালীনতা এবং পুরো কাঠামো শারিয়াহর আলোকে বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
১৩. মিডিয়া ও বিনোদন: ইসলামে এমন বিনোদন নিষিদ্ধ যা অশ্লীলতা, মিথ্যাচার, শিরক বা হারাম কাজের প্রচার করে। মিডিয়া কন্টেন্ট এবং বিনোদনমূলক কার্যক্রম যেন শারিয়াহর সীমারেখা লঙ্ঘন না করে, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ” (সূরা আন-নূর, ২৪:১৯) অর্থাৎ, “যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন তোমরা জান না” । শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে মিডিয়া কন্টেন্ট (চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, টেলিভিশন প্রোগ্রাম) এবং বিনোদনমূলক কার্যক্রম, কন্টেন্টের বিষয়বস্তু, বার্তা, উপস্থাপনা, সঙ্গীত ও চিত্রায়ণ বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
১৪. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম এবং গবেষণার বিষয়বস্তু যেন ইসলামী মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে শারিয়াহর মূলনীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ইসলামী জ্ঞান এবং মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে কি না, এবং গবেষণাগুলো শারিয়াহসম্মত সীমার মধ্যে রয়েছে কি না, পাঠ্যক্রমের বিষয়বস্তু, গবেষণার উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি এবং অর্থায়নের উৎস বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
এমনভাবে জীবনের প্রত্যেকটি ধাপে শারিয়াহ স্ক্রিনিং এর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য, হালালভাবে জীবন পরিচালনা করতে জীবনের প্রত্যেকটি পদক্ষেপে শারিয়াহ স্ক্রিনিং তথা যাচাই বাছাই করা প্রত্যেক মু’মিনের ঈমানী দায়িত্ব। তাই শারিয়াহ স্ক্রিনিং নিয়ে নিজে সচেতন হোন, অপরকে সচেতন করুন।
আইএফএসির ফেসবুক পেইজ থেকে গৃহীত




