ইমদাদুল হক
জ্ঞানের আলোয় আলোকিত কল্যাণকর মানুষ ছাড়া কল্যাণকর সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব বিনির্মাণ করা সম্ভব নয়। এজন্য খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে সমগ্র মানবতা যখন ধ্বংস-গহ্বরের কিনারায় উপনীত তখন মহান আল্লাহ তাদের মুক্তির জন্য আসমান থেকে যে দিকনির্দেশনা প্রেরণ করেন তার প্রথম নির্দেশ ‘পড়ো’। সেই ঐশী আলোয় আলোকিত মানুষ দ্বারা নির্মিত ও পরিচালিত কল্যাণকর সমাজ ও বিশ্ব ইতিহাস দীর্ঘদিন প্রত্যক্ষ করেছে। দেড় হাজার বছরের জার্নিতে পৃথিবী আজ আবার কল্যাণকর জ্ঞান থেকে দূরে সরে গেছে। জ্ঞানচর্চা আছে; কিন্তু আজ জ্ঞানচর্চা মানেই হচ্ছে, অন্যকে ঠকিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিলের কৌশল শেখা। এভাবে মানবতা আজ আবার উপনীত হয়েছে সেই ধ্বংস-গহ্বরের কিনারায়। এখনও যদি তার এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হয়, কল্যাণকর জ্ঞানের মাধ্যমে কল্যাণকর মানুষ তৈরির কোনো বিকল্প নেই।
কল্যাণকর সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে ‘কল্যাণকর জ্ঞান কল্যাণকর মানুষ’ স্লোগানকে সামনে রেখে কতিপয় বিদ্যানুরাগী ও কল্যাণকামী তরুণ চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলা শহরে গড়ে তুলেছেন কল্যাণকর জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র— নিমগ্ন পাঠাগার। নামকরণের দিক থেকে ‘নিমগ্ন’ শব্দটি বেছে নেওয়া হয়েছে গভীর মনোসংযোগ ও একাগ্রতার প্রতীক হিসেবে। যেখানে পাঠক জ্ঞানচর্চায় নিবিষ্ট ও নিমগ্ন হবেন ইবাদতের অনুভূতি ও একাগ্রতা নিয়ে এবং আহরিত জ্ঞান সমাজে ছড়িয়ে দেবেন কল্যাণের প্রত্যয় নিয়ে।
২০২২ সালের ১৩ জুলাই বুধবার আলমডাঙ্গা শহরের হোটেলপট্টি লেনের প্রবেশ মুখে সূর্যমুখী স্টোরের দ্বিতীয় তলায় পাঠাগারটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে পাঠাগারটি আনন্দধাম মহল্লার ইলিয়াস টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত এবং সাত সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। পরিষদের সদস্যরা হলেন : সভাপতি মাওলানা ইমদাদুল হক, সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান রানা, সহ-সাধারণ সম্পাদক নাদিউজ্জামান রিজভী, কোষাধ্যক্ষ মাহফুজুর রহমান, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আহমাদ কাজল এবং মিডিয়া সম্পাদক মাওলানা আব্দুল্লাহ ও তাওহিদুল ইসলাম খান। এছাড়াও নেপথ্যে থেকে পাঠাগারটি প্রাণবন্ত ও সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন একঝাঁক তরুণ-উদ্যমী স্বেচ্ছাসেবক।
বর্তমানে পাঠাগারে রয়েছে সকল বয়েসি পাঠকের উপযোগী ভাষা, সাহিত্য, ব্যাকরণ, ইতিহাস, জীবনী, আত্মজীবনী, ভূগোল, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিত, ধর্ম, দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, ব্যবসা, ভ্রমণকাহিনি ইত্যাদি ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন ভাষার দুই হাজারের অধিক বই। আর পাঠক সংখ্যা প্রায় ৩০০; যার মধ্যে সক্রিয় পাঠকও শতাধিক। এছাড়াও পাঠাগারে রয়েছে দুটি বিশেষ আয়োজন। ১. বিজ্ঞান কর্নার, ২. নারী ও শিশু কর্নার।
পাঠাগারটি মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি ছয়দিন আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত খোলা থাকে। লাইব্রেরিয়ান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন সাহিত্যানুরাগী ও মার্জিত রুচির অধিকারী মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ। যদিও প্রত্যেক দিনই নারী ও শিশু-কিশোররা যেতে পারে, তবুও শুক্রবার নারীদের জন্য এবং শনিবার শিশু-কিশোরদের জন্য রয়েছে বিশেষ প্রহর। প্রতিদিন পাঠাগারে বইপাঠের জন্য উপস্থিত হন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঠক। তারা পাঠাগারে বসে বই-পুস্তক পাঠ করেন এবং প্রয়োজনে বাসায়ও নিয়ে যান। এজন্য তাদের কোনো ফি দিতে হয় না।
বইপাঠ ছাড়াও নিমগ্ন পাঠাগারে শুরু থেকেই নিয়মিত পাঁচ ধরনের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রোগ্রাম হয়ে থাকে। ১. পাঠচক্র : নির্দিষ্ট বইয়ের পাঠ ও পঠিত বইয়ের পর্যালোচনা, ২. স্বরচিত কবিতা পাঠ ও পঠিত কবিতার ভাঁজপত্র প্রকাশ, ৩. লেখকের কথা : এ অনুষ্ঠানে আহূত হয়ে একজন লেখক তার লেখালেখি ও লেখক হয়ে ওঠার গল্প শোনান এবং নিজের সম্পর্কে শ্রোতাদের প্রশ্নের জবাব দেন, ৪. সাহিত্য আলাপন : বাংলা ও বিশ্ব সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত লেখক ও কবিদের কবিতা ও সাহিত্যের পাঠ ও পর্যালোচনামূলক অনুষ্ঠান এবং ৫. সমাজ সচেতনতামূলক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক দিবস ও ঘটনা নিয়ে আলোচনাসভা।
এছাড়াও পাঠাগারে অনুষ্ঠিত হয়েছে তিন বছরে তিনটি বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান। এসব অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত গুণীজনদের প্রাণবন্ত আলোচনা, কবিতা পাঠ, সংগীত পরিবেশন, নিয়মিত পাঠক ও রিভিউদাতাদের সম্মাননা, বই উপহার এবং তাৎক্ষণিক কুইজের মাধ্যমে বিজয়ী অতিথিদের পুরস্কৃত করা হয়। এসব প্রোগ্রামে সাহিত্যামোদী ও বিদ্যানুরাগীদের ছিল উপচে পড়া উপস্থিতি। ২০২২ সালে ১৩ জুলাই পাঠাগারটি উদ্বোধন করা হয়। সেদিন ছিল কুরবানির ঈদের তৃতীয় দিন; অর্থাৎ জিলহজ্জ মাসে ১২ তারিখ। এখন প্রতি বছর জিলহজ্জ মাসের ১২ তারিখেই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
পাঠাগার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা কমিটির বেশকিছু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : ডিজিটাল পাঠাগার ব্যবস্থা, গবেষণাপত্র ও ছোট কাগজ প্রকাশ, স্কুলকলেজ ও মাদরাসা পর্যায়ে পাঠাভ্যাস কর্মশালা এবং ‘নিমগ্ন পাঠাগার পুরস্কার’ প্রবর্তন। বিষয়গুলো নিয়ে পরিচালনা পরিষদের একাধিক মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছে।
পলাশির পরাজয়ের পর দীর্ঘদিন উপনিবেশ ও দাসত্বের মধ্যে থাকার কারণে বাঙালি মুসলমান সমাজ আত্মবিস্মৃত জাতিতে পরিণত হয়েছে। তারা তাদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। সর্বত্র সযতনে তারা নিজের মুসলিম পরিচয় উহ্য রাখার চেষ্টা করে থাকে। এ হীনমন্যতা থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজের শিক্ষিত শ্রেণিটিও মুক্ত নয়। এর আলামত তাদের জ্ঞানচর্চার অংশেও প্রকটভাবে পাওয়া যাবে। সারাদেশে যতগুলো পাঠাগার আছে, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, অন্য সব ক্যাটাগরির বই পর্যাপ্ত থাকলেও ধর্মীয় বই তেমন একটা নেই।
নিমগ্ন পাঠাগার কর্তৃপক্ষ এ হীনমন্যতা থেকে মুক্ত। তারা পাঠাগার প্রতিষ্ঠার দিনেই ঘোষণা দিয়েছেন, মানুষের জন্য কল্যাণকর জ্ঞানের সকল বই এখানে থাকবে। এক্ষেত্রে ধর্ম, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ের কোনো বাছবিচারহীন করা হবে না। পাঠক নিমগ্ন পাঠাগার কক্ষে প্রবেশ করলেই দেখতে পাবেন সেখানে দেয়াল জুড়ে শোভা পাচ্ছে অন্যসব বিষয়ের সাথে সাথে পর্যাপ্ত ধর্মীয় বই। কর্তৃপক্ষ এটাকে তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য করে।
নিমগ্ন পাঠাগার অল্প সময়েই হয়ে উঠেছে প্রগতিশীল ও কল্যাণকর পাঠচর্চার কেন্দ্রবিন্দু। বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে আলমডাঙ্গা শহর এবং দূর-দূরান্তের সাহিত্যামোদী ও বিদ্যানুরাগী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে।




