রাশিয়া কেন আলাস্কাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল, সে বিষয়ে নতুন করে আগ্রহ দেখা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টদের মধ্যে আলাস্কায় অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকের প্রেক্ষাপটে। শুক্রবার আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বৈঠকে বসবেন। এই বৈঠকের আলোচ্যসূচি হলো ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান।
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও ঔপনিবেশিক শাসন
রাশিয়ার আলাস্কা নিয়ন্ত্রণ শুরু হয় ১৭২৫ সালে, যখন জার পিটার দ্য গ্রেট ডেনিশ নাবিক ভিটাস বেরিংকে আলাস্কার উপকূল অন্বেষণে পাঠান। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও অঞ্চলটি ছিল জনবসতিহীন। ১৭৯৯ সালে জার পল প্রথম “রাশিয়ান-আমেরিকান কোম্পানি”কে আলাস্কার শাসনের অধিকার দেন। সিটকা ঔপনিবেশিক রাজধানী হয় ১৮০৪ সালে, যখন রাশিয়ানরা স্থানীয় ত্লিংগিত উপজাতিকে পরাজিত করে।
কঠোর আবহাওয়া, দূরত্ব, সরবরাহ ঘাটতি ও মার্কিন প্রতিযোগিতার কারণে রাশিয়ার শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে বড় বসতি গড়ে তোলার মতো সামরিক ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যও রাশিয়ার ছিল না।
ক্রিমিয়ান যুদ্ধের প্রভাব
ক্রিমিয়ান যুদ্ধে (১৮৫৩–১৮৫৬) রাশিয়ার পরাজয় ঔপনিবেশিক নীতিকে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে। যুদ্ধ ব্যয় ছিল প্রায় ১৬০ মিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিং। এদিকে অতিরিক্ত শিকারের কারণে আলাস্কা আর লাভজনক ছিল না। ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত কানাডার নৈকট্য ভবিষ্যৎ সংঘাতে এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল।
জার আলেকজান্ডার দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত নেন যে আলাস্কা বিক্রি করলে তহবিল আসবে এবং ব্রিটেনের সম্ভাব্য দখল থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয়
আমেরিকান গৃহযুদ্ধের পর ১৮৬৭ সালের ৩০ মার্চ, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম সিওয়ার্ড ৭.২ মিলিয়ন ডলারে আলাস্কা কেনার চুক্তি করেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র ১.৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার জমি অধিগ্রহণ করে।
প্রাথমিকভাবে এই ক্রয়কে “সিওয়ার্ডের বোকামি” বলা হয়। নিউ ইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন একে “তুষারের মরুভূমি” হিসেবে উল্লেখ করে। তবে ১৮৯৬ সালের ক্লোনডাইক গোল্ড স্ট্রাইক এই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেয়।
অর্থনৈতিক রূপান্তর
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আলাস্কার অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় হয়। মাছ ধরা, বিশেষ করে স্যামন ও হ্যালিবাট, বড় শিল্পে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ অবকাঠামো উন্নয়ন ঘটায়।
১৯৬৮ সালে প্রুধো উপসাগরে তেলের মজুদ আবিষ্কার রাজ্যের অর্থনীতিকে আমূল বদলে দেয়। তেল রাজস্ব আলাস্কার স্থায়ী তহবিল গঠনে সহায়তা করে, যা বাসিন্দাদের বার্ষিক লভ্যাংশ প্রদান করে। এর ফলে আলাস্কায় কোনো রাজ্য আয়কর বা বিক্রয়কর নেই।
আজ আলাস্কার অর্থনীতি তেল, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, মাছ ধরা এবং পর্যটনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। পর্যটকরা এর জাতীয় উদ্যান ও হিমবাহের জন্য আকৃষ্ট হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
যদিও আলাস্কার ইতিহাস জমি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত, তবে ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে ট্রাম্প ও পুতিনের বৈঠক কোনো ভূখণ্ড বিনিময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে না—এমনটাই আশা করছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
সূত্র : আল জাজিরা




