শুক্রবার সন্ধ্যায় আলাস্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তিন ঘন্টার শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেন। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে রাশিয়া এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা জোর দিয়ে বলে আসছে যেকোনো সমাধান থেকে তাদের বাদ দেয়া উচিত নয়।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পুতিন জানান, আলোচনা ছিল ‘দরকারী এবং বিস্তারিত‘ এবং তা একটি ‘গঠনমূলক পরিবেশে‘ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইউক্রেনের সমাধান ‘টেকসই হতে হবে এবং রাশিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনায় নিতে হবে।‘
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আজ সত্যিই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি,‘ তবে স্বীকার করেন যে ‘এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা আমরা অতিক্রম করতে পারিনি।‘ তিনি ইঙ্গিত দেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বিনিয়োগ অংশীদারিত্বের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলোসভ আলাস্কার আলোচনার পরিবেশকে ‘চমৎকার‘ বলে বর্ণনা করেন। বৈঠকের শুরুতে দুই রাষ্ট্রপ্রধান ‘শান্তি অর্জন‘ লেখা নীল পটভূমির সামনে পাশাপাশি বসেছিলেন। শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতির সময় আলাস্কা বিমানবন্দরে ট্রাম্প ও পুতিন করমর্দন করেন।
ক্রেমলিন জানায়, বৈঠকে অংশ নেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ, পররাষ্ট্র নীতি উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
শীর্ষ সম্মেলনের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে চান এবং যদি বৈঠক ব্যর্থ হয় তবে তিনি চলে যাবেন। তিনি সতর্ক করেন, ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি না হলে তিনি খুশি হবেন না। একইসঙ্গে জানান, বৈঠক সফল হলে দ্বিতীয় বৈঠকের পথ তৈরি হবে, অন্যথায় আর কোনও বৈঠক হবে না।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি দ্রুত যুদ্ধবিরতি দেখতে চাই… আজ যদি আমরা তা না পাই তবে আমি খুশি হব না।‘ তিনি যোগ করেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকেও এই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকতে হবে। ট্রাম্প আরও বলেন, তার ও পুতিনের মধ্যে ‘একটি ভালো স্তরের শ্রদ্ধা‘ রয়েছে।
শীর্ষ সম্মেলনের আগে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেছিলেন: ‘অনেক কিছু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।‘
রাশিয়ার অবস্থান
ক্রেমলিন অনুমান করেছিল বৈঠকটি ছয় থেকে সাত ঘন্টা স্থায়ী হতে পারে। রাশিয়া আঞ্চলিক লাভ অর্জনের পর ইউরোপীয় নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে পুতিন ট্রাম্পকে ইউক্রেনের উপর চাপিয়ে দেওয়া একটি সমঝোতায় আনতে পারেন। পুতিন মার্কিন প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আলোচনার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার নিয়ন্ত্রণে চুক্তি হতে পারে।
তিনি আলাস্কায় সফরে যান, যা ১৯ শতকে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে বিক্রি করেছিল। ইউক্রেন আক্রমণের পর এটি ছিল তার প্রথম পশ্চিমা দেশে ভ্রমণ।
ট্রাম্প পূর্বেও পুতিনের প্রশংসা করেছেন। ২০১৮ সালের হেলসিঙ্কি শীর্ষ সম্মেলনের পর তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, যখন তিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার অবস্থানের বিপরীতে পুতিনের দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। তবে এবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কোনও নিষ্পত্তি তিনি জেলেনস্কিকে বাদ দিয়ে করবেন না।
সুরের পরিবর্তন
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ক্ষমতায় এলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ শেষ করবেন। তবে এবার জেলেনস্কির উপর তার চাপ ব্যর্থ হয়। ট্রাম্প সতর্ক করেন, পুতিন যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করলে ‘খুব গুরুতর পরিণতি‘ হতে পারে।
জেলেনস্কি ট্রাম্পকে রাশিয়াকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর আহ্বান জানান। বৃহস্পতিবার লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার এবং বার্লিনে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের কাছ থেকে তিনি সমর্থন পান। ইউরোপীয় নেতারা জোর দিয়ে বলেন, পুতিনের কাছে যুদ্ধবিরতির সুযোগ রয়েছে।
তবে জেলেনস্কি ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা আশঙ্কা করেন, ট্রাম্প সংঘাত স্থগিত করে রাশিয়ার আংশিক ভূখণ্ড দখলকে মেনে নিতে পারেন। ট্রাম্প অবশ্য পরিষ্কার করেন, ইউক্রেনের ভূমি বিনিময়ের সিদ্ধান্ত কেবল ইউক্রেনের।
নিষ্ফল কূটনীতি
ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে বহু কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হয়েছে, তবে বন্দী বিনিময় ছাড়া কার্যকর কোনো ফল পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ ৮৪ জন যুদ্ধবন্দী বিনিময় করেছে।
শীর্ষ সম্মেলনের স্থান এলমেনডর্ফ-রিচার্ডসন বিমান ঘাঁটিটি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও শীতল যুদ্ধের সময় এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
সূত্র : আল জাজিরা




