আমানউল্লাহ রাইহান
ইমাম আল-ফারাবি শাসক হওয়ার জন্য যেসব গুণাবলি-বৈশিষ্ট্য শর্ত করেছেন তা থেকে এটা স্পষ্ট যে, একমাত্র নবী-রাসূলগণের মধ্যেই এমনসব বৈশিষ্ট্যের পূর্ণ সম্মিলন ঘটে। অর্থাৎ— প্রধান শাসকের মধ্যে নবী-রাসূলদের সমপর্যায়ের গুণাগুণ থাকতে হবে। যাদেরকে আল্লাহ তাআলা নবী ও শাসক হওয়ার তথা দুনিয়াতে আল্লাহর ‘খলিফা’ হওয়ার যোগ্যতা, গুণাবলি দিয়ে প্রেরণ করেছেন।
এজন্য বুদ্ধিমত্তা, প্রকৃতিগত চিন্তা-কল্পনার ক্ষমতা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, কর্মদক্ষতা, চারিত্রিক উৎকর্ষ, সত্তাগতভাবে স্বভাবজাত রাজনৈতিক প্রবৃত্তি (সিয়াসি ফিতরতের অধিকারী), শাসননীতি— সর্বক্ষেত্রে সর্বপ্রকার বৈশিষ্ট্যধারী সবজান্তা ‘ইনসানে কামেল’ যিনি হবেন, তিনিই হবেন শাসক। নগরীর প্রধান শাসক। এই শাসকের পরিচয় দিতে গিয়ে এক জায়গায় তিনি লিখেছেন,
وإنما يكون ذلك الإنسان إنسانا قد استكمل، فصار عقلا و معقولا بالفعل. ( المدينة الفاضلة: القول في العضؤ الرئيس)
সেই মানুষটি (প্রধান শাসক) হবে ইনসানে কামেল, যাবতীয় গুণে ও বৈশিষ্ট্যে যে পূর্ণতা লাভ করেছে। এবং সে হবে আকল ও মাকুলের প্রতীক।
আকল ও সর্বপ্রকার জ্ঞানের আধার— এমনভাবে যে সে হয়ে উঠবে আকল ও জ্ঞানের প্রতীক। রূপক অর্থে যাকে আকল ও জ্ঞান বলে পরিচয় দেওয়া যাবে। অর্থাৎ— যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গেছে এবং আল্লাহর সত্তা থেকে নিঃসৃত ‘আকল’ (العقل الفعال)–এর সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে। সর্বজ্ঞ ও সবজান্তা হবার কারণে, জ্ঞান বলতে তাকেই বোঝাবে। এটার উদাহরণ অনেকটা ‘যায়েদই ন্যায়বিচার’ (زيد عدل) এর মতো। অর্থাৎ— ন্যায়-ইনসাফের এমন স্তরে যায়েদ পৌঁছে গেছে যে, ‘যায়েদ’ মানেই এখন ‘ইনসাফ’ বোঝায়। যেমনটা ‘আপোসহীন নেত্রী’ বলতে বেগম জিয়াকে বুঝি আমরা। আপোসহীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি।
ইমাম আল-ফারাবি শাসকের জন্য সর্জ্ঞানী হবার যে-শর্ত করেছেন এটা তিনি সম্ভবত নিয়েছেন কুরআনে বর্ণিত আদম আ.–এর সৃষ্টি ও খিলাফত প্রদান সংক্রান্ত আয়াত থেকে। যেখানে আল্লাহ তাআলা আদম আ. কে সৃষ্টি করার পূর্বেই এক মহান অনুগ্রহের ঘোষণা করেছেন বনি আদমের ওপর। তা হলো ‘খিলাফত’–এর নিয়ামত। আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে স্বীয় স্থলাভিষিক্ত হিসেবে বনি আদমকে নির্বাচিত করে মহিমান্বিত করেছেন।
যে খলিফা হবে সে যার প্রতিনিধি তার যাবতীয় গুণাবলির অধিকারী হতে হবে। আল্লাহ তাআলার সমস্ত সিফাত তার মধ্যে বিদ্যমান থাকতে হবে। কারণ প্রত্যেক প্রতিনিধির মধ্যে সে যার প্রতিনিধি তার গুণাবলি থাকা বাঞ্ছনীয়।
আল্লামা শাব্বির আহমাদ উসমানি রাহ. সূরা আল-বাকারাহর ৩২ নং আয়াতের তাফসিরে লিখেছেন—
“আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ.কে প্রত্যেক বস্তুর নাম, তার গুণাগুণ, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, উপকারিতা ও অপকারিতা শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং এই জ্ঞান কথার মাধ্যম ছাড়া (সরাসরি) তাঁর অন্তরে ঢেলে দিয়েছিলেন। কেননা, জ্ঞানের এই পূর্ণতা ছাড়া খেলাফত ও দুনিয়ার উপর হুকুমত সম্ভব নয়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের উল্লিখিত বিষয়াবলী সম্পর্কে এভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘যদি তোমরা এই কথায় সত্য হও যে, তোমরা খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে পারবে, তবে এসব দ্রব্যের নাম ও গুণাগুণ বর্ণনা কর।’
কিন্তু তাঁরা নিজেদের দুর্বলতা ও অপূর্ণতার কথা স্বীকার করলেন এবং বুঝতে পারলেন যে, এই সার্বিক জ্ঞান ছাড়া দুনিয়ার বুকে কেউই খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। আর এই সার্বিক জ্ঞানের কিছুটা আমাদের দেওয়া হয়ে থাকলেও এতটুকুতে আমরা খেলাফতের যোগ্য হতে পারি না। এই উপলব্ধির পর ফেরেশতাগণ বলে উঠলেন, ‘আপনার জ্ঞান ও হেকমতের নাগাল পাওয়া কারো দ্বারা সম্ভব নয়।’” (তাফসিরে উসমানি)
এখানে লক্ষণীয়, আল্লাহ তাআলা খলিফা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইবাদতের চেয়ে ইলমকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইবাদত হলো বান্দার কাজ, খিলাফত হলো আল্লাহর বৈশিষ্ট্য। আর খিলাফত ও হুকুমতের জন্য জরুরি হলো ইলম। খিলাফতের দায়িত্ব নিতে ফেরেশতাদের অপারগতা প্রকাশ এবং ইবলিসের বঞ্চিত হওয়ার মূল কারণ হলো ইলম। ইবাদতকে যদি মানদণ্ড নির্ধারণ করা হতো তাহলে নিঃসন্দেহে ফেরেশতারা এবং তাদের সাথে ইবলিস ছিল যোগ্যতর। তাছাড়া ইবলিসের ফেরেশতাসম ইবাদতগুজার হওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল দুনিয়ার নেতৃত্ব লাভ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা খলিফা হবার জন্য শর্ত করেছেন সর্বজ্ঞানী হওয়াকে। এজন্য তিনি আদম আ. কে সর্বপ্রকার ইলম দান করেছেন দুনিয়াতে প্রেরণের পূর্বে। অন্যদের মধ্যে ছিল আংশিক ইলম, যা খিলাফত ও হুকুমতের জন্য যথেষ্ট বা উপযুক্ত নয়।
আল-ফারাবি শাসকের জন্য তথা খলিফা হবার জন্য যেসব বৈশিষ্ট্য শর্ত করেছেন তা হযরত আদম আ. সৃষ্টির মৌল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনুযায়ী উল্লেখ করেছেন। এ থেকে এই বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে যায়, স্রেফ আখিরাতমুখী ইলম দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা যেমন সম্ভব নয় তেমনি স্রেফ ধর্মতত্ত্বের জ্ঞানের জোরে খলিফা হওয়ার উপযুক্ততাও প্রতীয়মান হয় না। খলিফা হতে হলে ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনেও দখল থাকতে হবে। রাজকার্য পরিচালনা, দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করতে ধর্মতত্ত্বের চেয়ে অপরাপর জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনের জরুরত বেশি।
খুলাফায়ে রাশেদীনের প্রতি আমরা লক্ষ্য করতে দেখতে পাই যে, তাঁরা প্রত্যেকেই একই সাথে কুরআন-সুন্নাহর সবচেয়ে দক্ষ আলিম ফকিহ, মুজাহিদ, সমরবিদ, প্রযুক্তিবিদ, ভূগোলবিদ, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, মনোবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, বিশ্লেষক—মোদ্দাকথা তৎকালীন পৃথিবীতে শাসনকার্যের, নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় যাবতীয় ইলমে তাদের দখল ছিল। এভাবেই তাঁরা ‘খিলাফত’–এর শর্তাবলিতে উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়েছন।
সুতরাং পৃথিবীর নেতৃত্ব নিতে হলে যেসব জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন ক্ষমতার দখল নিয়েছে সেগুলির নেতৃত্বও কব্জায় নিতে হবে। এবং খিলাফত–এর তামাম শর্তাবলিতে উত্তীর্ণ হতে হবে।




