ইরান, মধ্যপ্রাচ্য

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ : জাঙ্গেজুর করিডোর নিয়ে তেহরানের সম্ভাব্য পদক্ষেপ

৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পৃষ্ঠপোষকতায় আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে শান্তি ও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ ও আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান উপস্থিত ছিলেন।

এই চুক্তি দক্ষিণ ককেশাসের অর্থনীতি, কৌশল ও নিরাপত্তায় কাঠামোগত প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিধান রাখা হয়েছে। তবে এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে রাশিয়া ও চীনের ককেশাস নীতি, বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে। ইরানের জন্যও এটি কৌশলগত প্রভাব বয়ে আনতে পারে, বিশেষত উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের নিরাপত্তা, ইউরেশিয়ার সাথে সংযোগ এবং আঞ্চলিক শক্তি প্রক্ষেপণের ক্ষেত্রে।

বছরের পর বছর ইরান জাঙ্গেজুর করিডোরকে বাধা দেওয়ার নীতি অনুসরণ করেছে। তেহরান একে “তুরান করিডোর” আখ্যা দিয়ে আসছে এবং আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে এটি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোকে অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিতে পারে।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরানের ভেতরে সরকারি ও সামরিক মহলে প্রতিক্রিয়া একরকম ছিল না। একদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে শান্তি প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক অবদান হিসেবে উল্লেখ করেছে, তবে একই সাথে বিদেশি সামরিক উপস্থিতিকে স্থায়ী হলে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদ ও বিপ্লবী গার্ড কর্পস কর্মকর্তারা তীব্র ভাষায় চুক্তির সমালোচনা করেছেন। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের উপদেষ্টা আলী আকবর বেলায়াতি পর্যন্ত বলেছেন যে জাঙ্গেজুর হবে “আমেরিকার জন্য কবরস্থান”।

রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান তুলনামূলকভাবে সতর্ক ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, করিডোর আর্মেনিয়ার আইনি সার্বভৌমত্বের অধীনে থাকবে বলে আশ্বাস পেয়েছেন। তবে করিডোর পরিচালনায় মার্কিন কোম্পানির অংশগ্রহণকেই তিনি একমাত্র উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

চুক্তি স্বাক্ষরের কিছুদিন পর আর্মেনিয়া সফরে গিয়ে পেজেশকিয়ান আর্মেনিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার নানা চুক্তি করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল আরাস নদীর ওপর দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ এবং রেলওয়ে সংযোগ সম্প্রসারণ। আর্মেনিয়া আশ্বস্ত করেছে যে তার ভূখণ্ড দিয়ে যাওয়া সব পরিবহন লাইন তার আইনি সার্বভৌমত্বের অধীনে থাকবে।

ইরানের সামনে সম্ভাব্য তিনটি পথ

বর্তমান পরিস্থিতিতে জাঙ্গেজুর করিডোরকে ঘিরে ইরানের সম্ভাব্য নিকট-মেয়াদী পদক্ষেপগুলোকে তিনভাবে সংক্ষেপ করা যায়—

১. নীতি পরিবর্তন করে অংশগ্রহণ
ইরান তার পূর্বের বাধা নীতি পরিত্যাগ করে সরাসরি করিডোর প্রকল্পে অংশ নিতে পারে। তেহরান যে “আরাস করিডোর” প্রস্তাব করেছিল, সেটিকে জাঙ্গেজুর করিডোরের দক্ষিণ সম্প্রসারণ হিসেবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারে। এতে ইরানকে প্রকল্পের অংশীদার হওয়ার সুযোগ দেবে।

২. চীনের সাথে সমন্বয়
চীন করিডোর নিয়ে এখনো স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। তবে বেইজিং যদি এটিকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের জন্য হুমকি মনে করে, তাহলে ইরান-চীন যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টা দেখা যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে চীন, ইরান ও রাশিয়া মার্কিন প্রভাবমুক্ত বিকল্প করিডোর স্থাপনে সহযোগিতা বাড়াতে পারে।

৩. নিরাপত্তা অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা
ইরান চাইলে তার কিছু আঞ্চলিক মিত্রের মাধ্যমে দক্ষিণ ককেশাসে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। তবে কঠিন অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জের কারণে আপাতত এ পথে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

সব মিলিয়ে, জাঙ্গেজুর করিডোর নিয়ে ইরানের অবস্থান এখনো দ্বিধাগ্রস্ত। রাজনৈতিক ও সামরিক অভ্যন্তরীণ বিভাজন তেহরানের কৌশলকে জটিল করে তুলেছে। আগামী মাসগুলোতে ইরান কোন পথে এগোয়, তা নির্ধারণ করবে দক্ষিণ ককেশাসের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনীতি।

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top