ইসরাইলে গাজা শহর দখলের পরিকল্পনা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামরিক বিতর্ক ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করছে। এ সময় সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ ইয়াল জামির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে লেখা এক চিঠিতে বন্দী বিনিময় চুক্তি গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
ইসরাইলের চ্যানেল ১৩ জানিয়েছে, জামির সতর্ক করেছেন যে গাজা শহর দখল অভিযান বাস্তবায়িত হলে বন্দীদের জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে এই বার্তার তাৎপর্য, এর সময়কাল এবং সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা
ইসরাইলি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুহান্নাদ মুস্তাফা জামিরের বার্তাকে তিনটি কারণে ব্যাখ্যা করেছেন।
প্রথমত, সেনাবাহিনী ‘গিডিয়ন্স ওয়াগনস’ অভিযানে তাদের মিশন সম্পন্ন করেছে এবং হামাসের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তি প্রস্তুত করেছে। দ্বিতীয়ত, নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত ছাড়াই আরেকটি অভিযান শুরু করা আগের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি করবে এবং সেনাবাহিনীকে ক্লান্ত করবে। তৃতীয়ত, তিনি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজনের আশঙ্কা দেখেছেন, যা নীরব অবাধ্যতা ও সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
মুস্তাফার মতে, জামির একজন সতর্ক ব্যক্তি, যিনি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের হুমকি না দিয়ে আংশিক বন্দী বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও রিজার্ভ বাহিনীকে স্বস্তি দিতে চান।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক হোসাম শাকের বলেন, গাজা শহর ধ্বংসের হুমকি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং একটি ঐতিহাসিক কেলেঙ্কারি। তার মতে, এই অবস্থান দেখায় যে গাজায় ইসরাইলি যুদ্ধ এখন পর্যন্ত জয়ের পথে নয়।
সামরিক বিশ্লেষণ
সামরিক বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল ফায়েজ আল-দুওয়াইরি মনে করেন, জামিরের চিঠি কয়েকটি চাপের কারণে এসেছে:
১. সামরিক সাফল্যের কোনও নিশ্চয়তা নেই।
২. বন্দীদের উদ্ধার নিশ্চিত নয়।
৩. সেনাবাহিনীর উচ্চ ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
৪. অভিযান দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে, যা সেনাবাহিনীর পক্ষে সামলানো কঠিন।
৫. হামাসকে ধ্বংস করা ও একই সঙ্গে বন্দী উদ্ধারের লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী।
তার মতে, ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ভেতরে হতাশা বাড়ছে, এবং ঘোষিত ও গোপন লক্ষ্যগুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব অভিযানের ব্যর্থতার বীজ বপন করছে। একটি শহর ধ্বংস করার পরিকল্পনাকে তিনি “সামরিক নয়, অপরাধমূলক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত” হিসেবে উল্লেখ করেন।
মার্কিন অবস্থান
হোয়াইট হাউসের প্রাক্তন যোগাযোগ কর্মকর্তা মার্ক ফাইফার জানান, ওয়াশিংটন জামিরের সতর্কবার্তাকে হামাসের সামরিক ক্ষমতার আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধসহ অন্য বিষয়ে বেশি মনোযোগী।
ফাইফারের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কোনও বিরোধী অবস্থান নেবে না বরং গাজা দখল চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমর্থন দেবে।
মুস্তাফা মনে করেন, যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনই এখন প্রধান চালিকা শক্তি। তবে প্রয়োজনে যুদ্ধ থামানোর জন্য ট্রাম্প চাপ প্রয়োগ করতে পারেন।
গাজা শহর দখল নিয়ে ইসরাইলে তীব্র রাজনৈতিক ও সামরিক বিতর্ক চলছে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন, বন্দীদের নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রশ্ন এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের সমর্থন নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাহস জুগিয়েছে।
সূত্র : আল জাজিরা




