গাজার বিরুদ্ধে ইসরাইলের বিমান হামলা, অবরোধ এবং ধীরে চলা দুর্ভিক্ষ-নির্ভর গণহত্যার প্রেক্ষিতে বিশ্বের ২৮টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সম্প্রতি একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। এতে তারা গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান এবং সেখানে মানবিক দুর্দশাকে ‘নতুন গভীরতায়’ পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করেন। অথচ, জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বহু আগেই দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও এই দেশগুলো কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।
এই বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে কয়েকটি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে—যেমন আয়ারল্যান্ড, স্পেন, সাইপ্রাস, মাল্টা, পোল্যান্ড, আইসল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে এবং স্লোভেনিয়া। ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে স্বীকৃতি দেবে। তা সত্ত্বেও, এসব দেশ ইসরাইলের সঙ্গে ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা কার্যকর কোনও চাপ প্রয়োগ করেনি।
বাণিজ্যচিত্র
অর্থনৈতিক জটিলতার পর্যবেক্ষণ সংস্থা OEC-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এই দেশগুলো ইসরাইলের সঙ্গে আমদানি ও রপ্তানি উভয় খাতে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যে জড়িত ছিল। নিচে কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো:
ফ্রান্স: আমদানি ১.৩১ বিলিয়ন, রপ্তানি ১.৯১ বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাজ্য: আমদানি ২.১২ বিলিয়ন, রপ্তানি ১.৮৫ বিলিয়ন ডলার
আয়ারল্যান্ড: আমদানি ৩.৮৯ মিলিয়ন, রপ্তানি ৬৯০ মিলিয়ন ডলার
ইতালি: আমদানি ১.০৯ বিলিয়ন, রপ্তানি ৩.৪৯ বিলিয়ন ডলার
কানাডা: আমদানি ৯৭৪ মিলিয়ন, রপ্তানি ৩৮৬ মিলিয়ন ডলার
শীর্ষ বাণিজ্যিক পণ্যের মধ্যে রয়েছে: মোটরযান, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, ভ্যাকসিন এবং সুগন্ধি। উদাহরণস্বরূপ, আয়ারল্যান্ডে ইসরাইল থেকে প্রায় ৩.৫৮ বিলিয়ন ডলারের ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট আমদানি করা হয়। ইতালি ২০২৩ সালে ইসরাইলে সর্বাধিক রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ১১৬ মিলিয়ন ডলারের গাড়ি।
ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া
ইসরাইল এই বিবৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন মারমোরস্টাইন সামাজিক মাধ্যম X-এ বলেন, বিবৃতিটি “বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন” এবং “হামাসকে ভুল বার্তা পাঠায়।”
মানবিক চাপ ও ‘বিরতি’
ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য গাজায় জরুরি যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। ইসরাইল আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ‘কৌশলগত বিরতি’ ঘোষণা করে। এই বিরতি কার্যকর হওয়ার কথা বলা হলেও, বাস্তবে তার ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
রবিবার ভোরেই ইসরাইলি বাহিনী কমপক্ষে ৪৩ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে। একই দিনে গাজায় অপুষ্টি ও অনাহারে মৃত্যু হয় আরও ছয়জনের, যাদের মধ্যে দুটি শিশু ছিল। দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩৩ জনে, যার মধ্যে ৮৭ জন শিশু।
ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতির বিবৃতি, মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং রাষ্ট্র স্বীকৃতির ঘোষণা যতই উচ্চারিত হোক না কেন, বাস্তবতার নিরিখে এসব দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইসরাইলের সঙ্গে অব্যাহত রয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, কূটনৈতিক বিবৃতির ভাষা আর অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে এক গভীর ফারাক রয়ে গেছে।
সূত্র : আল জাজিরা




