কাতারের রাজধানী দোহায় নতুন যুদ্ধবিরতি ও বন্দী বিনিময় চুক্তির লক্ষ্যে ইসরাইল এবং ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের প্রতিনিধিদল আলোচনায় বসার পর বিশ্বজুড়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। আলোচনার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওয়ারেন্ট থাকা সত্ত্বেও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ছয় মাসের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো ওয়াশিংটন সফর করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
দোহার আলোচনায় মূল বিরোধের বিষয়বস্তু তিনটি। গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর প্রত্যাহার, মানবিক সাহায্যের প্রবেশ এবং বিতরণ প্রক্রিয়া ও যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি দৃঢ় গ্যারান্টি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতার নিরিখে এই আলোচনার ফল হতে পারে ‘জানুয়ারি ২০২৫ চুক্তির’ মতো একটি সীমিত ৬০ দিনের চুক্তি, যার ভঙ্গকারী ছিল ইসরাইল নিজেই- গত ১৮ মার্চ।
হামাসের অচল আপসের শর্ত
‘দ্য কোর্স অফ ইভেন্টস’ প্রোগ্রামের রাজনৈতিক গবেষক সাঈদ জিয়াদ বলেছেন, হামাস আলোচনায় তিনটি মূল বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়- হত্যা ও বাস্তুচ্যুতি বন্ধ; অনাহার ও অবরোধের অবসান; গাজা উপত্যকার বাফার জোনে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার।
হামাস মনে করে, পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তার বিনিময়ে পুরো গাজাকে একটি বিশাল খোলা কারাগারে পরিণত করা ‘কম ধ্বংসাত্মক’ মনে হলেও আসলে এটি দীর্ঘমেয়াদে ফিলিস্তিনিদের চরম ক্ষতিসাধন করবে।
ইসরাইলের অবস্থান ও বিকল্প
যুদ্ধের ২১ মাস পরে ইসরাইল উপলব্ধি করেছে যে হামাস এখনো গাজায় সক্রিয় রয়েছে। তাই তারা যুদ্ধ বন্ধের জন্য একটি সামরিক উপায় খুঁজছে, যার মধ্যে গাজার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখলে রাখা এবং ফিলাডেলফি ও মোরাগ করিডোরে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও অন্তর্ভুক্ত। তবে হামাস-শাসিত গাজায় পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার বা যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতির মতো শর্তে ইসরাইল একমত নয়।
ইসরাইলি বিশ্লেষক মুহান্নাদ মুস্তাফার মতে, নেতানিয়াহু সরকার চূড়ান্ত যুদ্ধোত্তর ব্যবস্থার একটি সমাধান খুঁজছে, যা অন্তর্বর্তী চুক্তি নয়। তার মতে, ইসরাইলের সামনে দু’টি স্পষ্ট বিকল্প রয়েছে- সমগ্র গাজা দখল করে এর জনসংখ্যাকে বাস্তুচ্যুত করার চেষ্টা; যুদ্ধ বন্ধ করে বাফার জোনে ফিরে যাওয়া, গাজা পুনর্গঠনে অংশ না নেয়া এবং হামাসকে প্রশাসনিক ও সামরিকভাবে পুনর্গঠনের সুযোগ না দেয়া।
নেতানিয়াহু দ্বিতীয় বিকল্পটির দিকে বেশি ঝুঁকছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন গ্যারান্টির অনুপস্থিতি
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ওয়াশিংটন কোনো ধরনের গ্যারান্টি দিতে অনিচ্ছুক। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সাবেক কর্মকর্তা থমাস ওয়ারিক বলেন, আমেরিকা মনে করে হামাস গাজায় নিজের কর্তৃত্ব হারাতে চায় না এবং আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে চায়।
এ প্রেক্ষিতে আমেরিকার পরিকল্পনা হলো একটি অন্তর্বর্তীকালীন আন্তর্জাতিক প্রশাসন, যা দলনিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা পরিচালিত হবে। সেখানে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন থাকবে। এই বাহিনী গাজার সামরিকীকরণ রোধ করবে এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার জন্য একটি পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইসরাইলি ওয়ালা নিউজ জানিয়েছে, ট্রাম্প চান গাজায় যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে নেতানিয়াহুর সাথে ঐকমত্যে পৌঁছাতে এবং আসন্ন বৈঠকে এই ইস্যুটিই মুখ্য হয়ে উঠবে।
গাজা কে নিয়ন্ত্রণ করবে?
সর্বশেষ আলোচনার মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- যুদ্ধের পর গাজা কে শাসন করবে? ইসরাইল ও আমেরিকা উভয়ই গাজাকে লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো মডেলে পরিণত হওয়া থেকে বিরত রাখতে চায়। ফলে যুদ্ধ থামানোর শর্তগুলো শুধু যুদ্ধবিরতি নয়। বরং রাজনৈতিক শাসনের ভবিষ্যত নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: আল জাজিরা




