ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে টানা ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হলেও দুই দেশের উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি। বিভিন্ন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের সমাপ্তি মানে সংঘাতের ইতি নয়, বরং ভবিষ্যৎ আরও বিস্তৃত সংঘাতের সূচনা।
নেতানিয়াহু ও ইসরাইলি নেতৃত্বের বার্তা
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু খোলাখুলিভাবে বলেছেন, ইসরাইল ইরানি জনগণকে মুক্ত করার উপায় প্রস্তুত করছে। তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জিওরা আইল্যান্ড সতর্ক করে বলেছেন, “ভবিষ্যতে আমরা এই যুদ্ধকে প্রথম ইরান যুদ্ধ বলব, কারণ ইরানের সঙ্গে এক বা একাধিক যুদ্ধের সূত্রপাত প্রায় নিশ্চিত।”
এটি ইঙ্গিত করে যে ইসরাইলি নীতি–নির্ধারক মহলে এখন উপলব্ধি তৈরি হয়েছে—সাম্প্রতিক সংঘাত প্রক্সি যুদ্ধ বা গোপন অভিযানের সীমা ছাড়িয়ে প্রত্যক্ষ সংঘাতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
নিরাপত্তা গবেষকদের মত
ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের ইরান ও শিয়া অক্ষ গবেষণা কর্মসূচির পরিচালক রাজ জিম্মট লিখেছেন, “ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হয়নি। ইসরাইলি ও মার্কিন হামলা সাময়িক প্রতিক্রিয়া দিলেও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সৃষ্ট হুমকির সামগ্রিক সমাধান দিতে পারেনি। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিহিত আছে তেহরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের মধ্যে।”
সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান তামির হেইমান বলেছেন, “দীর্ঘমেয়াদে হুমকি অদৃশ্য হয়নি। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন না হলে ইরান ইসরাইলের জন্য হুমকি হিসেবেই থাকবে। যুদ্ধ শেষে ইরান দুর্বল হলেও কম বিপজ্জনক নয়।”
মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক মার্কিন কূটনৈতিক উপদেষ্টা সুজান ম্যালোনি লিখেছেন: “ইরান দুই দশকের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন। তবে তাদের পতন হয়েছে মানে এই নয় যে তারা পরাজিত হয়েছে। মিশন সম্পন্ন হয়েছে বলা এখনই অকাল হবে।”
অন্যদিকে, বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে এ বছরের শেষের আগে ইরান–ইসরাইলের নতুন যুদ্ধ শুরু হবে এবং তা আগের ১২ দিনের যুদ্ধের চেয়েও রক্তাক্ত হবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সূত্রে জানা যায়, গত জুলাইয়ে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো পুনরুদ্ধার ঠেকাতে প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেবে ইসরাইল।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরানের জেনারেল স্টাফ সতর্ক করেছে, নতুন কোনও মার্কিন বা ইসরাইলি আক্রমণের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া হবে। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি বলেছেন, ইরান এখন কার্যত যুদ্ধাবস্থায় আছে, যদিও একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চলছে।
ইসরাইলের কৌশলগত লক্ষ্য
মার্কিন সহায়তায় ইসরাইলের চালু করা “রাইজিং লায়ন” অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবকাঠামো—বিশেষ করে সেন্ট্রিফিউজ, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ ধ্বংস এবং শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের নির্মূল করা।
ক্ষতির মাত্রা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এ আঘাত মাত্র কয়েক মাস বা এক বছরের বিলম্ব ঘটিয়েছে; অন্যদের মতে, এটি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা কার্যত ধ্বংস করেছে। তবে ইসরাইল মনে করে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে ইরান দ্রুত তার সক্ষমতা পুনর্গঠন করবে, কারণ প্রয়োজনীয় জ্ঞান তাদের হাতে রয়েছে। একই সঙ্গে, তেল বিক্রির আয় ইরানকে উন্নত অস্ত্র কেনা ও মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন করার সুযোগ দেবে।
তেল আবিব বিশ্বাস করে, এখনই প্রধান প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার সুবর্ণ সুযোগ। এজন্য তারা ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক ভাঙতে, তহবিল বন্ধ করতে, মিত্রদের নিরস্ত্রীকরণ ও নেতাদের নির্মূল করতে চায়। গত যুদ্ধেই ইসরাইল তেহরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর সদর দপ্তর, “থার আল্লাহ” কর্পসের কার্যালয় এবং কুখ্যাত এভিন কারাগার লক্ষ্যবস্তু করেছিল। একই সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হুমকিও দেওয়া হয়। যদিও এসব প্রচেষ্টা শাসনব্যবস্থা দুর্বল করতে পারেনি, তবু ইসরাইলের উদ্দেশ্য স্পষ্ট—অভ্যন্তরীণ ভাঙন সৃষ্টি।
পরবর্তী ধাপের শঙ্কা
তেল আবিব আশঙ্কা করছে, ইরান এ যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও শক্তিশালীভাবে ফিরে আসবে। হেইমান সতর্ক করে বলেছেন, “সাফল্যের উপর নির্ভর করা ঠিক নয়। সাধারণত পরাজিত পক্ষ বিজয়ীর চেয়ে বেশি শেখে।”
রাজ জিম্মটও জোর দিয়েছেন, ইসরাইলকে অবশ্যই কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, গোয়েন্দা ও সামরিক সব উপায় ব্যবহার করে ইরানকে দুর্বল করতে হবে।
গবেষণা সংস্থার প্রস্তাব
ইসরাইলি ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় সুপারিশ করা হয়েছে—পারমাণবিক ইস্যুতে সমাধান হলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখতে হবে। এজন্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড, সন্ত্রাসবাদে সমর্থন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দ্রুত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নেতা খামেনি ও শীর্ষ রাজনৈতিক–সামরিক কর্মকর্তাদের নির্মূল করে শাসনব্যবস্থা অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা বিবেচনা করা যেতে পারে। ১২ দিনের যুদ্ধকে এই কৌশলের পরীক্ষামূলক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শাসন পরিবর্তনে গোপন অভিযানের কৌশল
ইরানের অভ্যন্তরে সামরিক, নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক সত্তার নেতৃত্বে নাগরিক সমাজ সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের মতো শক্তি কেন্দ্রগুলির সহযোগিতায় শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনকে উৎসাহিত করার জন্য গোপন অভিযানের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন ইসরাইলি বিশেষজ্ঞরা। এর সঙ্গে বহিরাগত আর্থিক, সাংগঠনিক, লজিস্টিক এবং এমনকি সামরিক সহায়তা প্রদানের বিষয়ও রয়েছে, যা শাসনব্যবস্থার পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। একইসঙ্গে নির্বাসিত বিরোধী দলগুলিকে সংগঠিত ও প্রস্তুত করা, যাতে অভ্যন্তরে কোনও বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হলে তারা দ্রুত ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করতে পারে—এমন দৃষ্টিভঙ্গিও প্রতিফলিত হয়েছে।
জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতাকে উস্কে দেওয়া, অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে উৎসাহিত করা এবং শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানি শাসনব্যবস্থা উৎখাতের প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য বাধার সম্মুখীন হয়। একদিকে, ইরানের ভেতরে সরাসরি স্থল আক্রমণ চালানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠানের বহুস্তরীয় কাঠামো যেকোনো নেতৃত্ব-শূন্যতা সৃষ্টি রোধ করে। তবু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরানি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে আরও বাস্তববাদী দলগুলিকে সমর্থন দিয়ে তাদের কাছে এমন একটি চুক্তি গ্রহণ করানো সম্ভব, যা পারমাণবিক প্রকল্পের অবসান ঘটাবে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং হিজবুল্লাহর মতো মিত্র গোষ্ঠীগুলির সহায়তা বন্ধ করবে।
ইরানের প্রতিকারমূলক কৌশল
২০২৪ সালের নভেম্বরে ইরানের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা কামাল খারাজি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, অস্তিত্বগত হুমকি দেখা দিলে ইরান তার পারমাণবিক মতবাদ পরিবর্তন করতে পারে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা রয়েছে এবং এতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।” এটি ছিল প্রথমবারের মতো কোনো শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বের প্রকাশ্য ইঙ্গিত যে পারমাণবিক বিকল্পকে সর্বশেষ ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, চাপের কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না এবং সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদের ইচ্ছা ভাঙা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের তিনটি অগ্রাধিকার স্পষ্ট:
১. শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা রক্ষা করা।
২. প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া।
৩. ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পকে আরও শক্তিশালী করা।
তবে ইরান আজ দুটি বড় বাধার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ইসরাইলের হুমকি, অন্যদিকে ইউরোপীয় ত্রয়ীর (ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য) হুঁশিয়ারি—পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের জন্য “স্ন্যাপব্যাক” প্রক্রিয়া সক্রিয় করা হবে। এতে ব্যাপক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ফের কার্যকর হবে। অন্যদিকে, মার্কিন শর্তে আলোচনায় ফেরা মানে তেহরানের কাছে নিজের নীতির ব্যর্থতা স্বীকার করা। ফলে সামনে দুটি তিক্ত বিকল্প: হয় এমন একটি সমঝোতা, যা কয়েক দশক ধরে অর্জিত ক্ষমতা কেড়ে নেবে, নতুবা নতুন উত্তেজনা, যা অর্থনৈতিক ও সামরিক সংকটকে গভীর করবে এবং শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলবে।
তেহরান মার্কিন প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছে। ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসা পর্যন্ত একাধিক ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে তারা বলছে, ছাড় দিলেই আরও চাপ আসবে। ইরাকি বাথ শাসনামলের পতনের অভিজ্ঞতা তাদের সামনে সতর্কবার্তা হিসেবে রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে আলী লারিজানিকে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মহাসচিব করা হয়েছে এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর লক্ষ্য রাষ্ট্রপতির সরাসরি কর্তৃত্বাধীন নিরাপত্তা, সামরিক ও নির্বাহী সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো। একইসঙ্গে, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে বৈঠকগুলো পারমাণবিক সমস্যা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। উন্নত অস্ত্র কেনা এবং নতুন দফা যুদ্ধের প্রস্তুতিও এর অংশ।
ভবিষ্যতের সূচক
মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন ও বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত থেমে নেই; বরং এটি আরও জটিল ও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
ইরান চাপ সহ্য করেছে, শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, আবার পারমাণবিক বা আঞ্চলিক প্রকল্প থেকেও সরে আসেনি। বরং তারা আরও নিশ্চিত হচ্ছে যে প্রচলিত প্রতিরোধ যথেষ্ট নয়। পারমাণবিক সামরিক বিকল্পই শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার একমাত্র বীমা হতে পারে। অন্যদিকে, ইসরাইল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে ইরানকে তার ক্ষমতা পুনর্নির্মাণ করতে দেওয়া মানে সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করা।
এই পরিস্থিতি উভয় পক্ষকে প্রায় অনিবার্য সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সামনে যে কোনো যুদ্ধ আগের তুলনায় আরও রক্তাক্ত ও ব্যাপক হতে পারে। আল-আকসা ইন্তিফাদার প্রতিক্রিয়ার মতো ঘটনাগুলো অঞ্চলটির মানচিত্র ও শক্তির ভারসাম্যকে পুনর্নির্মাণ করছে। ইসরাইলি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্যের বাজি নিজস্ব বিপর্যয়ে গিয়ে ঠেকতে পারে, যেখানে তাদের একক বিজয়ের স্বপ্ন ভেঙে যেতে পারে।
সূত্র : আল জাজিরা




