যখন ইসরাইল বিশাল এলাকাজুড়ে তার সামরিক শক্তি নিয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে, ইরানের দূরতম প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে, তখন তারা বিশ্বের সকল দেশের উপর রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা করছে যাতে এই অঞ্চলের বাস্তবতার বর্ণনা এবং দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেয়া যায়। জাতিসঙ্ঘ যখন তাদের সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করে, তখন ইসরাইল জাতিসঙ্ঘ, এর মহাসচিব এবং এর সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে তীব্র লড়াই চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যখন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, তখনও ইসরাইল এর কঠোর সমালোচনা করেছে।
ইসরাইল বিশ্বকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছে—সভ্য ও বর্বর। নিজেকে সভ্যতার অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর, পশ্চিমা কিছু দেশের অবস্থান তাদের অবাক করলেও যখন এসব দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়, ইসরাইল তাদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালায় এবং শাস্তি দেওয়ার প্রস্তুতির কথাও ঘোষণা করে। ইসরাইলের কাছে আমেরিকার সমর্থনই যথেষ্ট—পুরো আমেরিকা না হলেও অন্তত রিপাবলিকান পার্টি, কিংবা ডানপন্থী ধর্মপ্রচারকদের সমর্থন। তবে অনেক ইসরাইলির কাছে এটাই ধ্বংসের রেসিপি।
অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ যখন খান আল-আহমারে বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়ে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বপ্ন সমাহিত করার কথা বলেন, তখন সমালোচকরা মনে করেন, তিনি একইসাথে ইহুদি রাষ্ট্রকেও সমাহিত করছেন।
‘পাগল রাষ্ট্র’ ও নৈতিক পতন
ইসরাইলি অধ্যাপক ড. টোমার পার্সিকো ফেসবুকে লিখেছেন, ইসরাইল এখন বিশ্বের চোখে একটি “পাগল রাষ্ট্র”, যার নেতৃত্বে সীমাহীন ধর্মান্ধরা আছে। তার মতে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি কেবল তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ নয়, বরং ইসরাইলের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার হাতিয়ার। তিনি বলেন, অনেকের কাছে ইহুদি সার্বভৌমত্ব মানবতার জন্য সম্ভাব্য ভয়াবহতা।
ইসরাইলি বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন—যদি ইসরাইল সমাজের একটি অংশ এই ধারণা মেনে নেয় যে দেশটি নৈতিক ব্যর্থতার মডেলে পরিণত হয়েছে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ভিত্তিই হারিয়ে যাবে।
ভেতর থেকে সতর্কবার্তা
‘জাগো, ইসরাইলিরা’ শিরোনামে মারিভ পত্রিকায় ইফ্রাইম গ্যানোর লেখেন, রাষ্ট্র তার পথ হারিয়েছে। তার মতে, নেতানিয়াহু সরকারকে উৎখাত না করলে ইহুদিবাদী প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। সাবেক রাষ্ট্রদূত বারুচ বিনা সতর্ক করেছেন, গাজা দখল ইসরাইলকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা বিপর্যয়ে নিমজ্জিত করবে।
তার মতে, ইসরাইল এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও তাকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফেলতে চায়। সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ঢেউ শুরু হতে পারে। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের সময়কার আন্তর্জাতিক বয়কটের উদাহরণ টেনে বলেন, ইসরাইলকেও ফিফা, ইউরোভিশন ও বৈজ্ঞানিক সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে।
অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ ও তৃতীয় মন্দির ধ্বংসের আশঙ্কা
এক প্রাক্তন কূটনীতিক সতর্ক করেছেন, চলমান যুদ্ধকে তৃতীয় মন্দির ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে দেখা যেতে পারে। তার মতে, মাতৃভূমির ধ্বংস রোধ করতে যুদ্ধ বন্ধ করে জিম্মিদের ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি।
ইসরাইলিদের ভেতর হতাশা
গীতিকার ইয়াকভ গিলাদ বলেছেন, একটি মহা বিপর্যয় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি গাজার শিশু হত্যাযজ্ঞকে হলোকস্টের সাথে তুলনা করেছেন। তার মতে, গাজায় হতাশা ও ক্ষতির মধ্যে জন্ম নেওয়া তরুণরা শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েই বেড়ে ওঠে।
ইয়েদিওথ আহরোনোথের বিশ্লেষক বেন-ড্রর ইয়েমিনি বলেছেন, হামাস সামরিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবে ইসরাইলকে পরাজিত করছে। তার মতে, ইসরাইলের উচিত পতন থামানোর সুযোগ কাজে লাগানো, নচেৎ আরও একাডেমিক, সাংস্কৃতিক ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে।
লিওর বেন-শাউল লিখেছেন, ইসরাইলের বর্তমান সংকট আসলে একটি অস্তিত্বগত ভূমিকম্প। হামাস কেবল যুদ্ধে জয়ী হয়নি, বরং অজেয় রাষ্ট্রের মিথ ভেঙে দিয়েছে। তার মতে, দুই বছরের মধ্যে বর্তমান আকারে ইসরাইল আর থাকবে না।
ভেতর থেকেই বিচ্ছেদ
ওয়ালা! ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধে আভ্রাহাম বার্গ ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, ধর্ম, ভূমি, ক্ষমতা, ভাষা ও সার্বভৌমত্বের মিশ্রণে তৈরি ইসরাইলি প্রকল্প আজ দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাখ্যার সেবায় পরিণত হয়েছে। হিংসাত্মক মেসিয়ানিক মিলিশিয়ারা রাষ্ট্রকে ভেঙে দিয়েছে।
ইসরাইলের সমাপ্তির সতর্কবার্তা
ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোশে শারেটের ছেলে ইয়াকভ শারেট বহু আগেই বলেছিলেন, ইসরাইলের সমাপ্তি অবশ্যম্ভাবী। তিনি অভিবাসনের বিরোধিতা করে ফিলিস্তিনের সমর্থক হয়ে ওঠেন এবং অন্ধকার দিনের সতর্কবার্তা দেন।
সূত্র : আল জাজিরা




