ইউরোপীয় ইমাম সফর

ইসরাইল সফরে ইউরোপীয় ‘ইমামদের’ একটি প্রতিনিধিদল

‘ইউরোপীয় ইমাম’ উপাধিধারী একটি প্রতিনিধিদলের সাম্প্রতিক ইসরাইল সফর এবং সেখানে রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হার্জোগের সাথে তাদের সাক্ষাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। সফরের সময় ও প্রেক্ষাপট ঘিরে টুইটার ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা এবং তীব্র নিন্দার আবহ তৈরি হয়।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, রাষ্ট্রপতি হার্জোগ ইউরোপ থেকে আগত একটি মুসলিম প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান, যারা বৈঠকে ‘আন্তঃধর্মীয় সহাবস্থান’ বিষয়ে আলোচনা করেন। এই বৈঠকের একটি ভিডিও রাষ্ট্রপতি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন, যা মুহূর্তেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বিশেষ করে এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন প্রায় দুই বছর ধরে চলছে।

অনেক টুইটার ব্যবহারকারী এই সফরের সময় ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা মনে করেন, এটি ছিল ইসরাইলি দখলদারিত্বের বাস্তবতা আড়াল করার এবং তথাকথিত ধর্মীয় বৈধতা প্রদানের এক প্রচেষ্টা। সফরের অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় যাচাই করে অনেকেই দেখতে পান, প্রতিনিধিদলের বেশিরভাগই প্রকৃত ইমাম ছিলেন না। বরং কিছু মসজিদের স্বেচ্ছাসেবক, প্রশাসক অথবা সাধারণ ধর্মানুরাগী ছিলেন, যাদের কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় মর্যাদা নেই।

সমালোচকদের ভাষ্যে, এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনি জনগণের দুঃখ-কষ্টকে উপেক্ষা করে দখলদার শক্তির পক্ষে বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়ানো। অনেকে সফরটিকে আরব ও ইসলামী নীতির লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেন। কারণ জেরুজালেম এখনো অধিকৃত আরব ও ইসলামী ভূমি এবং এই ইস্যুতে আপস অগ্রহণযোগ্য। ‘জাতির কণ্ঠস্বর’ হিসেবে এসব প্রতিনিধিকে উপস্থাপন করাকে তারা সত্য বিকৃতির অংশ বলে মন্তব্য করেন।

আরো অনেক টুইটার ব্যবহারকারী ইসরাইলি রাষ্ট্রপতির ভূমিকার দিকেও আঙুল তোলেন, যিনি নিজেই এমন এক প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানান, যাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ে বিশেষ পরিচিতি বা গ্রহণযোগ্যতা নেই। তারা বলেন, এটি আসলে ইসরাইলের নিজস্ব সঙ্কট এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা।

এই প্রসঙ্গে ইমাম হাসান চালঘৌমির অংশগ্রহণও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। তিনি বহুদিন ধরেই ইসরাইলি নীতির প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাবের জন্য পরিচিত। এবার তার সফরকে অনেকেই ‘লাল রেখা অতিক্রম’ করার মতো বলে মনে করেছেন। তিনি শুধু সফরে অংশগ্রহণ করেই থেমে থাকেননি। বরং দখলদারিত্বের বর্ণনার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান অপরাধ উপেক্ষা করায় তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ আরো তীব্র হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই জোর দিয়ে বলেন, ‘আব্রাহামিক শান্তি’ কথাটি তখনই অর্থবোধক, যখন তা ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, রক্তপাতের নয়।

এই সমালোচনার সর্বশেষ অধ্যায় ছিল ডাচ শহর আলকমারের বিলাল মসজিদ ফাউন্ডেশনের পদক্ষেপ, যারা এই সফরে অংশগ্রহণকারী ইমাম ইউসুফ মুসাবিহকে ধর্মপ্রচার এবং নামাজের নেতৃত্ব থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এটি ইসলামী নীতির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এবং স্বাভাবিকীকরণ প্রচেষ্টার প্রতি প্রত্যাখ্যান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এই সফর এবং তাকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া আরো একবার দেখিয়ে দিলো যে মুসলিম বিশ্ব এবং প্রবাসী মুসলিম সমাজে ফিলিস্তিন প্রশ্নে কোনো আপস কিংবা বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা সহজে গ্রহণযোগ্য নয়।

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top