আবু সাঈদ
সম্প্রতি মুফতি রেজাউল করিম আবরাব, আসিফ আদনান প্রমুখ ইসলামপন্থী অ্যাক্টিভিস্টদের জঙ্গি নাটকের বলি বানানো হয়েছে। এরপর অনেক সচেতন অ্যাক্টিভিস্টকে পোস্ট দিতে দেখলাম, ‘তুমি কে আমি কে, জঙ্গি জঙ্গি। কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচারের সঙ্গী।’ আমার মনে হয়, এভাবে চিন্তা করাটা তাদের ভুল। কেন? এই লেখাতে সেটিই বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি।
মূলত এই প্রতিবাদ স্লোগানটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আলোচিত স্লোগান- তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ এর আদলে তৈরি। তবে ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ এই স্লোগানটি সঠিক হলেও ‘তুমি কে আমি কে, জঙ্গি জঙ্গি; কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচারের সঙ্গী’ স্লোগানটি সঠিক নয়।
রাজকার আমাদের দেশে বিরোধী মতকে দমনের একটি সফল ন্যারেটিভ। সেজন্য আমাদের গণআন্দোলনে যখন আমরা সবাই মিলে এই ন্যারেটিভকে প্রতিহত করতে চাইলাম, সকলের অংশগ্রহণে তা সফল হলো। তাই রাজকারকে তখন বিরোধী মতকে দমনের ন্যারেটিভ হিসেবে কার্যকর করা যায়নি।
কিন্তু জঙ্গিবাদের প্রকৃতি রাজাকার থেকে ভিন্ন। এটি ভিন্নমত দমনের কোনো আঞ্চলিক ন্যারেটিভ নয় যে আমরা জাতীয় পর্যায়ে সবাই ‘জঙ্গিবাদী’ হয়ে গেলে এর মর্ম পাল্টে দেব। বরং এটি ভিন্নমত দমনের একটি বৈশ্বিক সফল ন্যারেটিভ। সেজন্য আমরা সবাই মিলেও যদি জঙ্গিবাদের অর্থকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে চাই, তাহলেও এই ন্যারেটিভ আমাদের স্বার্থ উদ্ধার করবে না। বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ অন্যরা তখন একে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করবে। পুরো দেশটিকে তখন জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। এতে চতুর্মুখী চাপে পড়বে দেশ। সেজন্য ‘তুমি কে আমি কে, জঙ্গি জঙ্গি; কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচারের সঙ্গী’ এই স্লোগানে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
স্বভাবতই এখন প্রশ্ন উঠবে, তবে আমাদের করণীয় কী? আমরা এক্ষেত্রে কয়েকটি কাজ করতে পারি-
১. ব্যাপক পরিসরে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে ইসলামপন্থীদের অবদান তুলে ধরা
ইসলামপন্থীদের হাতে রয়েছে বাংলাদেশের হাজার হাজার মসজিদের মিম্বর। রয়েছে মাহফিলের মঞ্চ। আছেন অনেক জনপ্রিয় পাবলিক ফিগার। রয়েছে লেখালেখির বিস্তৃত ময়দান। এসব মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ইসলাম কিভাবে জঙ্গিবাদ দমন রয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্র কিভাবে জঙ্গিবাদমুক্ত ছিল। বর্তমান সফল মুসলিম রাষ্ট্রগুলো কিভাবে জঙ্গিবাদকে প্রতিহত করছে। ইসলামপন্থীরা কিভাবে আদর্শের বলে জঙ্গিবাদের প্রভাবমুক্ত থাকছে, এই জাতীয় বিষয়গুলো ব্যাপক পরিসরে আলোচনায় রাখতে হবে। যেন ব্যাপকভাবে মানুষের মনে গেঁথে যায় যে ইসলামপন্থীদের সাথে জঙ্গিবাদের ন্যূনতম সম্পর্কও নেই। বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইসলামপন্থীদের দমনে এই ন্যারেটিভ ব্যবহার করা হয়।
২. প্রকৃত জঙ্গিদের দিকে ট্যাগ ফিরিয়ে দেয়া
জঙ্গিবাদ ন্যারেটিভের জনক হলো আমেরিকা। তারা জঙ্গিবাদ বলতে বিশ্ববাসীকে যে ধারণা দিয়েছে, সে অর্থে আমাদের দেশে জিরো পার্সেন্ট জঙ্গিবাদও নেই। তবে রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের সহিংসতা রয়েছে। আমাদের দেশীয় পরিমণ্ডলে যারা জঙ্গিবাদের ন্যারেটিভকে ব্যবহার করবে, তাদের সহিংস কর্মকাণ্ডকে তুলে ধরে সমাজে তাদেরকে জঙ্গি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আঘাতের তীর থেকে আস্তে আস্তে লক্ষ্য পরিবর্তন করে নেয়। যেন নিজের পাতা ফাঁদে তারাই পড়ে। তাহলে ভবিষ্যতে কেউ এই পথে পা বাড়াতে চাইলে চিন্তা-ভাবনা করবে।
৩. জঙ্গিবাদের তালিকা পেশ করা
প্রত্যেক দেশই জঙ্গিবাদের তালিকা করে থাকে। এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে বড় জঙ্গি ইসরাইলেরও একটি জঙ্গিতালিকা রয়েছে। আমাদেরকেও জঙ্গি তালিকা তৈরি করতে হবে। ব্যাপক পরিসরে তার প্রচার করতে হবে। তাদের জঙ্গিবাদী কার্যক্রম সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। তারা কিভাবে ইসলামপন্থীদের ঘাড়ে জঙ্গিবাদের দায় চাপিয়ে নিজের জঙ্গিবাদী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে সবাইকে দেখিয়ে দিতে হবে।
৪. ইসলামপন্থী যেসব দলকে জঙ্গি বানানো হয়েছে, তাদের বাস্তবতা তুলে ধরে ধারণা পাল্টে দেয়া
আমেরিকাসহ অনেক জঙ্গিবাদী দেশ নিজেদের স্বার্থে ইসলামপন্থী বিভিন্ন দলকে জঙ্গি হিসেবে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ওসব দলের বাস্তবতা জনপরিসরে তুলে ধরতে হবে। ব্যাপকভাবে এই আলোচনা করতে হবে। এর পাশাপাশি যারা তাদের জঙ্গি অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে, তাদের পেছনের স্বার্থকেও তুলে ধরতে হবে।
এই কাজগুলো এক-দু’জনের কাজ নয়। এর জন্য চতুর্মুখী প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এটি এক দুই বছরের প্রচেষ্টায় সফল হবে না। বরং সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। কেবল নিজ দেশকে নিয়ে নয়, পুরো বিশ্বকে নিয়ে এই ন্যারেটিভ মোকাবেলা করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।
লেখক : সম্পাদক, টুডেনিউজবিডিডটনে




