শায়খ ইবনুল কালাম
শরিয়ত আইন প্রয়োগের ক্ষমতা সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেয়নি। এমনকি তা কোনো মসজিদের ইমাম, মুফতি ও সমাজপতিদেরকেও দেয়নি। বরং কোনো মানুষ অপরাধ করলে তার বিচার রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে। এ বিষয়ে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন,
الزكاة والحدود والفيء والجمعة إلى السلطان
‘জাকাত, হুদুদ (নির্ধারিত শাস্তি), ফাই (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) ও জুমা সুলতানের (রাষ্ট্রের) দায়িত্ব।’ (ইবনে যানযুয়াহ প্রণীত কিতাবুল আমওয়াল, ৩ : ১১৫২, মারকাযুল মালিক ফয়সাল মুদ্রিত )
হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাতে বিভিন্ন তাবেয়ীন থেকে একই বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন,
عن الحسن أنه قال: أربعة إلى السلطان: الزكاة، والصلاة، والحدود، والقضاء. وعن ابن محيريز أنه قال: الجمعة، والحدود، والزكاة، والفيء إلى السلطان. وعن عطاء الخراساني أنه قال: إلى السلطان، الزكاة، والجمعة، والحدود
তথা, হাসান বসরী রহ. বলেন, চারটি জিনিসের দায়িত্ব সুলতানের উপর ন্যস্ত। তা হলো, যাকাত, সালাত, হুদুদ ও বিচার-আচার। ইবনে মুহায়রিজ রহ. বলেন, জুমা, হুদুদ, যাকাত ও ফাইয়ের দায়িত্ব সুলতানের উপর ন্যস্ত। আতা খোরাসানি রহ. বলেন, যাকাত, জুমা ও হুদুদের দায়িত্ব সুলতানের উপর ন্যস্ত। (মুসান্নাফ, ৫ : ৫০৭, দারুল ইলমের মুদ্রণ)।
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, স্বাধীন মানুষের ওপর রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা তাঁর নিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ আইন প্রয়োগ করতে পারবে না। কেননা নবী করিম (সা.)-এর যুগে তাঁর অনুমতি ছাড়া এবং মুসলিম খলিফাদের শাসনামলে তাঁদের অনুমতি ছাড়া কোনো হদ জারি করা হয়নি। (আল-উম্ম : ৬/১৫৪)
ইমাম সারাখসি রহ. বলেন,
واستيفاء الحدود إلى الإمام
তথা, হুদুদ প্রয়োগের দায়িত্ব হলো ইমামের (রাষ্ট্রের)। (শরহুস সিয়ারিল কাবির, পৃষ্ঠা : ১৯৩৮, আশ-শারিকাতুশ শারকিয়া লিল ইলানাত মুদ্রিত)
ইমাম কাসানী রহ. বলেন,
أن ولاية إقامة الحد إنما ثبتت للإمام لمصلحة العباد -وهي صيانة أنفسهم وأموالهم وأعراضهم- … والإمام قادر على الإقامة؛ لشوكته ومنعته وانقياد الرعية له قهرًا وجبرًا، ولا يخاف تبعة الجناة وأتباعهم؛ لانعدام المعارضة بينهم وبين الإمام، وتهمة الميل والمحاباة والتواني عن الإقامة منتفية في حقه، فيقيم على وجهها، فيحصل الغرض المشروع له الولاية بيقين … وللإمام أن يستخلف على إقامة الحدود؛ لأنه لا يقدر على استيفاء الجميع بنفسه؛ لأن أسباب وجوبها توجد في أقطار دار الإسلام، ولا يمكنه الذهاب إليها، وفي الإحضار إلى مكان الإمام حرج عظيم، فلو لم يجز الاستخلاف لتعطلت الحدود، وهذا لا يجوز؛ ولهذا كان عليه الصلاة والسلام يجعل إلى الخلفاء تنفيذ الأحكام وإقامة الحدود]
তথা, মানুষের কল্যাণার্থে হুদুদ প্রয়োগের দায়িত্ব ইমাম (রাষ্ট্র)-কে দেয়া হয়েছে। এতে মানুষের জান-মাল ও ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আর ইমাম এই বিধান বাস্তবায়নেও সক্ষম। কারণ, তার ক্ষমতা, শক্তি ও বল প্রয়োগ করে প্রজাদের তার কাছে আত্মসমর্পণের সামর্থ্য রয়েছে। তিনি অপরাধী ও তার দোসরদের ভয় পান না। কারণ, তাদের ইমামের সাথে হঠকারিতা করার মতো পর্যাপ্ত শক্তি নেই। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অন্যায় পক্ষপাত কিংবা হুদুদ প্রয়োগে অলসতার অভিযোগও থাকবে না। কারণ, তিনি তো সবার সামনেই তা প্রয়োগ করবেন। তখন দায়িত্ব দেয়ার উদ্দেশ্য সন্দেহাতীতভাবে অর্জিত হয়ে যাবে।
…ইমাম ইচ্ছে করলে হুদুদ বাস্তবায়নে কাউকে প্রতিনিধি বানাতে পারবেন। কারণ, সকল হুদুদ তার একার পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নাও হতে পারে। কেননা দেশের বিভিন্ন স্থানেই হুদুদ বাস্তবায়নের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। সব জায়গায় যাওয়া তো তার পক্ষে সম্ভব নয়। এটিকে বাধ্যতামূলক করা হলে ইমাম সঙ্কটে পড়তে পারেন। সুতরাং যদি প্রতিনিধি নিয়োগ বৈধ না হয়, তাহলে হুদুদ বাস্তবায়নটাই অসম্ভব হয়ে যাবে। আর তা তো হতে পারে না। এজন্য দেখা গেছে, রাসূল সা. নিজেও খুলাফায়ে কেরামকে বিভিন্ন বিধি-বিধান বাস্তবায়ন ও হুদুদ প্রয়োগের দায়িত্ব দিয়েছেন। (বাদায়েউস সানায়ে, ৭ : ৫৭-৫৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়ার মুদ্রণ)
ইসলামী আইন বিশ্বকোষে এসেছে : সব ইসলামী আইনজ্ঞ এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে যিনি আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রাখেন, তিনি হলেন রাষ্ট্রপ্রধান বা তাঁর প্রতিনিধি…। (আল-মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ : ৫/২৮০)
আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া অপরাধ
শরিয়তের সুস্পষ্ট বিধান- সাধারণ মানুষের জন্য আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। অতএব, প্রচলিত গণপিটুনির কারণ যা-ই হোক না কেন, ইসলামী শরিয়তে তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এমন অপরাধে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। হজরত ওমর রা.-এর শাসনামলে দেখা যায়, একজন নিরপরাধ বালককে হত্যা করার কারণে ওমর রা. সাত ব্যক্তিকে কিসাসের শাস্তি দিয়েছেন। তাদের বাড়ি ছিল ইয়েমেনের সানাআয়। এ বিষয়ে ওমর রা. বলেছিলেন,
لو اشْتَرَكَ فيها أهْلُ صَنْعاء لَقَتَلْتُهم
‘যদি সানাআর সব মানুষ মিলে হত্যা করত তাহলে আমি সানাআর সব মানুষের ওপর কিসাসের হুকুম বাস্তবায়ন করতাম। অর্থাৎ সানাআর সব অধিবাসীকে হত্যা করতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৮৯৬; নাসবুর রায়াহ : ৬/৩৬০; মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস : ১৫৭০)
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




