ভারত, কাশ্মির, ৩৭০ ধারা বাতিল, অন্ধরুতি রায়,

কাশ্মীর নিয়ে লিখিত ২৫ বই নিষিদ্ধ ভারত

ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে গত ৫ আগস্ট একটি সরকারি নির্দেশে ২৫টি বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার অধিকাংশই এই অঞ্চলের ইতিহাস, রাজনীতি এবং মানবাধিকার নিয়ে লেখা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি ‘জনগণের স্মৃতির উপর আক্রমণ’, যা ২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পর থেকে চলমান সেন্সরশিপ নীতিরই ধারাবাহিকতা। উল্লেখ্য যে, এই নিষেধাজ্ঞা এমন একটি দিনে আরোপ করা হয়, যা সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের ষষ্ঠ বার্ষিকী হিসেবে কাশ্মীরিরা কালো দিবস পালন করছিল।

লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোজ সিনহার অধীনস্থ হোম ডিপার্টমেন্ট ৫ আগস্টের নির্দেশে জানায়, এসব বই ‘ভুল ন্যারেটিভ’ প্রচার করে, বিচ্ছিন্নতাবাদকে উস্কানি দেয় এবং যুবকদের সন্ত্রাসবাদের পথে ঠেলে দেয়। এর প্রেক্ষিতে পুলিশ স্রিনগরের বইয়ের দোকানগুলোতে অভিযান চালিয়ে শতাধিক কপি জব্দ করেছে।

নিষিদ্ধ বইগুলোর তালিকায় আছেন খ্যাতিমান লেখক অরুন্ধতি রায়ের Azadi, এজি নুরানির The Kashmir Dispute 1947-2012, অনুরাধা ভাসিনের A Dismantled State, হাফসা কানজওয়ালের Colonizing Kashmir, সুমন্ত্র বোসের Kashmir at the Crossroads এবং ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ডের Kashmir in Conflict। সরকারি ভাষ্যে বলা হয়েছে, এসব বই তরুণদের মধ্যে ‘ভিকটিমহুড’ আর ‘টেররিস্ট হিরোইজম’ ছড়ায়, যা ভারতের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।

নিষিদ্ধের তালিকায় থাকা আ ডিসমেন্টেলড স্টেট এর লেখক এবং কাশ্মীর টাইমসের সম্পাদক অনুরাধা ভাসিন আল জাজিরায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই পদক্ষেপকে ‘প্যারানয়েড স্টেটের কাজ’ আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, তাঁর বই আসলে সত্য অনুসন্ধান করে, যা সরকারের তথাকথিত ‘শান্তি ও উন্নয়ন’-এর দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে। ভাসিনের অভিযোগ, এটি কাশ্মীরের বিকল্প আখ্যান মুছে ফেলার চেষ্টা, যা লেখক ও প্রকাশকদের ভয় দেখিয়ে ভবিষ্যতের গবেষণামূলক কাজকে নিরুৎসাহিত করবে।

অপর লেখক হাফসা কানজওয়াল বলেন, নিষেধাজ্ঞা সরকারের ভেতরের দুর্বলতা ও ভয়ের প্রমাণ, বিশেষত যখন একই সময়ে স্রিনগরে সরকারি বইমেলা চলছে। সুমন্ত্র বোস বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তাঁর বই মূলত শান্তির পথ অনুসন্ধান করে, সন্ত্রাসকে গৌরবান্বিত করে না।

কাশ্মীরে সেন্সরশিপের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের পর থেকেই অঞ্চলটি রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৮৯ সালে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকে সেন্সরশিপ, গ্রেপ্তার, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত ২০১৯ সালের পর এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, এটি এমন এক দমন-পদ্ধতি, যা কবি, সাংবাদিক ও একাডেমিকদের বিশেষভাবে লক্ষ্য করে।
সরকার দাবি করছে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু লেখক ও গবেষকরা বলছেন, তাঁদের কাজ গবেষণানির্ভর, সন্ত্রাস প্রচার নয়। সমালোচকদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা কেবল কাশ্মীরে নয়, গোটা ভারতে স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর নতুন প্রশ্ন তুলেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।

সূত্র : আল-জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস ও অন্যান্য

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top