রুকিয়া, কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক রুকিয়া,

কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক রুকিয়া : শরয়ী চিকিৎসার একটি গ্রহণযোগ্য পন্থা

ড. আলী মুহাম্মদ আস-সাল্লাবী

রোগ থেকে আরোগ্য লাভ ও শারীরিক-আধ্যাত্মিক ব্যাধির চিকিৎসায় রুকিয়াহ একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর পদ্ধতি। এটি কেবল রোগ নিরাময়ের জন্যই নয়। বরং জাদু, বদ নজর ও শয়তানি প্রভাব থেকে রক্ষার জন্যও ব্যবহৃত হয়। এর মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর কালাম কুরআনের আয়াতসমূহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসে বর্ণিত দোয়াসমূহ, যা ঈমান ও তাওয়াক্কুলের প্রকাশ।

রুকিয়া : একটি শরয়ী আমল

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস ও আমল অনুযায়ী, রুকিয়া একটি শরয়ী ও বৈধ চিকিৎসা পদ্ধতি। উত্তম হলো, একজন মুমিন নিজেই নিজের ওপর রুকিয়াহ করা, যেমন নবীজী নিজেও তা করতেন।

আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল (সা.) অসুস্থ হলে তিনি নিজেই মুআওয়িযাত (সূরা নাস ও সূরা ফালাক) পাঠ করে নিজের ওপর ফুঁ দিতেন। যখন ব্যথা বেশি হতো, তখন আমি তাঁর ওপর সেগুলো পড়ে ফুঁ দিতাম এবং বরকতের আশায় তাঁরই হাত দিয়ে শরীর মুছে দিতাম।’ (সহীহ বুখারী)।

কুরআনের আয়াত দ্বারা রুকিয়া

রুকিয়ার জন্য কুরআনে বহু আয়াত রয়েছে, যেগুলো শারীরিক ও আধ্যাত্মিক রোগের প্রতিকার ও সুরক্ষায় অত্যন্ত উপকারী। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আয়াত উল্লেখ করা হলো-

১. সূরা আল-ফাতিহা, সূরা আল-ইখলাস, সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস
এই চারটি সূরা সর্বাধিক ব্যবহৃত রুকিয়াহ সূরা হিসেবে সুন্নাহসম্মত। এগুলো রোগ নিরাময়, জাদু ও বদ নজর থেকে রক্ষার জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

২. সূরা আল-বাকারা
{واتبعوا ما تتلو الشياطين على ملك سليمان وما كفر سليمان ولكن الشياطين كفروا يعلمون الناس السحر وما أنزل على الملكين ببابل هاروت وماروت وما يعلمان من أحد حتى يقولا إنما نحن فتنة فلا تكفر فيتعلمون منهما ما يفرقون به بين المرء وزوجه وما هم بضارين به من أحد إلا بإذن الله ويتعلمون ما يضرهم ولا ينفعهم ولقد علموا لمن اشتراه ما له في الآخرة من خلاق ولبئس ما شروا به أنفسهم لو كانوا يعلمون}

এই আয়াত জাদু ও শয়তানি অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

৩. সূরা আলে ইমরান (৩:২৬-২৭)
{قل اللهم مالك الملك تؤتي الملك من تشاء وتنزع الملك ممن تشاء وتعز من تشاء وتذل من تشاء بيدك الخير إنك على كل شيء قدير تولج الليل في النهار وتولج النهار في الليل وتخرج الحي من الميت وتخرج الميت من الحي وترزق من تشاء بغير حساب}.

অনিষ্ট থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য এই আয়াত দুটি পাঠ করা যায়।

৪. সূরা ইউনুস (১০:১০৭)

{وإن يمسسك الله بضر فلا كاشف له إلا هو وإن يردك بخير فلا راد لفضله يصيب به من يشاء من عباده وهو الغفور الرحيم}.

৫. সূরা আল-ইসরা (১৭:৮২)

{وقل رب أدخلني مدخل صدق وأخرجني مخرج صدق واجعل لي من لدنك سلطانًا نصيرًا وقل جاء الحق وزهق الباطل إن الباطل كان زهوقًا وننزل من القرآن ما هو شفاء ورحمة للمؤمنين ولا يزيد الظالمين إلا خسارا}.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দোয়া ও রুকিয়া

নবীজির হাদীসে উল্লেখিত রুকিয়া-সংক্রান্ত দোয়াগুলো রোগ-ব্যাধি, বদ নজর ও জাদুর প্রভাব থেকে সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও ফলপ্রসূ। কিছু সুন্নাহসম্মত রুকিয়া দোয়া নিচে তুলে ধরা হলো,

(أذهب الباس رب الناس، اشفِ وأنت الشافي، لا شفاء إلا شفاؤك، شفاء لا يغادر سقمًا). [رواه البخاري]
(أعوذ بكلمات الله التامة، من كل شيطان وهامة، ومن كل عين لامة). [رواه البخاري]
(أعوذ بكلمات الله التامات من شر ما خلق). [صححه الألباني]
(بسم الله الذي لا يضرّ مع اسمه شيء في الأرض ولا في السماء وهو السميع العليم). [صححه الألباني]
(باسم الله أرقيك، من كل شيء يؤذيك، من شر كل نفس، أو عين حاسد، الله يشفيك باسم الله أرقيك). [رواه مسلم]
(باسم الله يبريك، ومن كل داء يشفيك، ومن شر حاسد إذا حسد، وشر كل ذي عين). [رواه مسلم]
(بسم الله أعوذ بعزة الله، وقدرته من شر ما أجد، وأحاذر). [صححه الألباني]
(أعوذ بكلمات الله التامات التي لا يجاوزهن بر ولا فاجر، من شر ما خلق وذرأ وبرأ، ومن شر ما ينزل من السماء، ومن شر ما يعرج فيها، ومن شر ما ذرأ في الأرض، ومن شر ما يخرج منها، ومن شر فتن الليل والنهار، ومن شر كل طارق إلا طارقًا يطرق بخير يا رحمن). [صححه الألباني]
(اللهم إني أعوذ بك من الشيطان الرجيم وهمزه ونفخه ونفثه). [ صححه الألباني]
(باسم الله، تربة أرضنا، بريقة بعضنا، يشفى سقيمنا، بإذن ربنا). [رواه البخاري]
(اللهم فاطر السماوات والأرض، عالم الغيب والشهادة، لا إله إلا أنت، رب كل شيء ومليكه، أعوذ بك من شر نفسي، ومن شر الشيطان وشركه، وأن أقترف على نفسي سوءًا، أو أجره إلى مسلم).[صححه الألباني]
(اللهم عافني في بدني، اللهم عافني في سمعي، اللهم عافني في بصري، لا إله إلا أنت). [صححه الألباني]

এসব আয়াত ও দোয়া পাঠ করার সময় আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা, বিশুদ্ধ নিয়ত এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। রুকিয়াহ কোনো যাদু নয়, বরং তা আল্লাহর কালাম এবং রাসূলের শেখানো আমল, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশেষ রহমত।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যতক্ষণ রুকিয়ায় শিরক মিশ্রিত না হয়, ততক্ষণ এতে কোনো দোষ নেই।’

রুকিয়ার শরঈ বিধান

রুকিয়া বৈধ, যদি তা পবিত্র কুরআন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ, আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ ও গুণাবলী অথবা কোনো বৈধ দোয়ার ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়। যেখানে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা, প্রয়োজনীয় সতর্কতা এবং এই বিশ্বাস অন্তর্ভুক্ত থাকে যে উপকার ও ক্ষতির একমাত্র মালিক আল্লাহই।

রুকিয়া শুরু করার পূর্বে অবশ্যই-

-পাপ ও সীমালঙ্ঘন থেকে খাঁটি তাওবা করতে হবে,
-আল্লাহর আনুগত্যে আত্মনিয়োগ করতে হবে এবং সালাত যথাসময়ে আদায় করতে হবে,
-দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে কুরআনই হলো আরোগ্য ও রহমত,
-কুরআনের অর্থ অনুধাবনের আগ্রহ রাখতে হবে,
-নিয়মিত রুকিয়া পাঠ করতে হবে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণাসহ হতাশাজনক প্ররোচনাকে উপেক্ষা করতে হবে।

রুকিয়ার প্রয়োজনীয়তা

রুকিয়া নিয়মিত করা উচিত। কারণ আল্লাহর ইচ্ছায় এটি মানুষের ওপর অদৃশ্য মন্দ প্রভাব, ক্ষতি ও শয়তানী আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। হিংসা, জাদু ও কুদৃষ্টিজনিত মানসিক ও শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে সহায়তা করে।

রুকিয়ার ফজিলত

রুকিয়া এক বিশেষ ফজিলতের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে এতে উৎসাহিত করেছেন। এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত নিম্নরূপ-

-এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক বিশেষ উপহার, যাতে রয়েছে আরোগ্য,
-এটি দুনিয়া ও আখিরাতের বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির একটি উপায়,
-রুকিয়া জাদু থেকে সুরক্ষা প্রদান করে,
-হিংসা ও তার কুপ্রভাব থেকে রক্ষা করে এবং চিকিৎসায় সহায়ক ভূমিকা রাখে,
-এটি বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে কার্যকর।

অতএব, রুকিয়া পালন একজন মুসলিমের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক অনুশীলন, যা আল্লাহর ইচ্ছায় মন্দ থেকে রক্ষা ও কল্যাণ লাভে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top