খতমে কুরআন, কুরআনের বিনিময়, কুরআন খতম

কুরআন খতম করে হাদিয়া নেয়ার বিধান

কুরআন তেলাওয়াত বরকত ও কল্যাণের উসিলা এবং এর সওয়াব মৃত বা জীবিত উভয়কেই পৌঁছে দেওয়া যায় । তাই ঈসালে সাওয়াব বা বরকতের উদ্দেশ্যে কুরআন খতম করা অবশ্যই জায়েজ, তবে কিছু বিষয়ের খেয়াল রাখা জরুরি ।
প্রথমত: যারা কুরআন খতমে অংশ নেবে, তাদের উদ্দেশ্য কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি হওয়া উচিত। আত্মীয়স্বজনের লজ্জা বা লোক দেখানো কারণে অংশগ্রহণ করা ঠিক নয়। আবার যারা অংশ নেয়নি, তাদের প্রতি খারাপ ধারণা করাও ঠিক নয়। আসলে একা বসে আন্তরিকতার সঙ্গে কুরআন তেলাওয়াত করা বেশি উত্তম, কারণ তাতে খালিস নিয়ত বেশি থাকে।
দ্বিতীয়ত: কুরআন সঠিকভাবে পড়া উচিত। ভুলভাবে পাঠ করলে হাদীসের সতর্কতার আওতায় আসবে “অনেক কুরআন পাঠকারী এমন আছে, যাদের বিরুদ্ধে কুরআনই অভিশাপ করে।”
তবে যদি কুরআন খতমের উপর পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয় বা প্রচলিত থাকে যে, যে পড়ার পর টাকা বা খাওয়া দেওয়া হবে, (যেমন আমাদের বাংলাদেশে রয়েছে ) তাহলে এটি ইসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে হলেও পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েজ নয়, কারণ এটি কুরআন তেলাওয়াতের বিনিময়ে মজুরি নেওয়া, যা শরীয়তে নিষিদ্ধ।
তবে যদি কুরআন চিকিৎসা, শিফা বা বরকতের উদ্দেশ্যে ওযিফা হিসেবে পড়ানো হয়, তাহলে এর বিনিময়ে কিছু নির্ধারণ করা জায়েজ, এমনকি আগেই ঠিক করা থাকলেও। এর প্রমাণ হাদীসে আছে সাহাবায়ে কেরাম এক অসুস্থ ব্যক্তিকে “রুকইয়া” (দম) করে শিফা দিয়েছিলেন, এবং তারা এর বিনিময়ে ত্রিশটি বকরির পাল নিয়েছিলেন। নবী করিম ﷺ তা অনুমোদন করেছিলেন।
যদি কেউ বলে “আমার অমুক কাজ হয়ে গেলে আমি কুরআন খতম করাব,” তাহলে এই মান্নত শরীয়তসম্মত নয়, কারণ অন্যকে দিয়ে কুরআন পড়ানো কোনো ফরজ বা ওয়াজিব ইবাদত নয়। তাই এই মানত কার্যকর হবে না । কিন্তু যদি কেউ বলে “আমি নিজে কুরআন পড়ব,” তাহলে তখন নিজেকেই পড়তে হবে; অন্য কাউকে দিয়ে পড়ালে মান্নত পূর্ণ হবে না।
দলিলসমূহ :
عن ابن عباس: أن نفراً من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم مروا بماء، فيهم لديغ أو سليم، فعرض لهم رجل من أهل الماء، فقال: هل فيكم من راق، إن في الماء رجلاً لديغاً أو سليماً، فانطلق رجل منهم، فقرأ بفاتحة الكتاب على شاء، فبرأ، فجاء بالشاء إلى أصحابه، فكرهوا ذلك وقالوا: أخذت على كتاب الله أجرا، حتى قدموا المدينة، فقالوا: يا رسول الله، أخذ على كتاب الله أجراً، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم:
«إن أحق ما أخذتم عليه أجراً كتاب الله».
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত — নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কয়েকজন সাহাবি এক স্থানে এসে পৌঁছালেন। সেখানে এক ব্যক্তি ছিল, যাকে কোনো বিষাক্ত প্রাণী দংশন করেছিল। ঐ এলাকার একজন এসে বলল, “তোমাদের মধ্যে কি কেউ ঝাড়ফুঁক (রুকইয়া) জানে? এখানে একজন দংশিত ব্যাক্তি রয়েছে ।”
সাহাবিদের একজন সেখানে গিয়ে সূরাহ ফাতিহা পড়ে তার উপর দম করলেন। লোকটি আরোগ্য লাভ করল। তখন ঐ ব্যক্তি কিছু ছাগল দিল। সাহাবিরা তা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করলেন এবং বললেন, “তুমি আল্লাহর কিতাবের ওপর পারিশ্রমিক নিয়েছো!” যখন তারা মদীনায় এলেন, তখন নবী করিম ﷺ-কে বিষয়টি জানালেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন —
“তোমরা যে জিনিসের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেবে, তার মধ্যে আল্লাহর কিতাবই সবচেয়ে হকদার।”
(সহীহ বুখারী, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩২)
قال أنس بن مالك: ‌رب ‌تال ‌للقرآن والقرآن يلعنه .
(إحياء علوم الدين ، كتاب أداب تلاوة القران، الباب الأول في فضل القران وأهله، وذم المقصرين في تلاوته، 273/1، ط : دارالمعرفة)
“হযরত আনাস বিন মালেক রা. বলেন, অনেক কুরআন পাঠকারীকে কুরআন অভিশাপ করে “(ইহয়াহু উলুমুদ্দীন ১/ ২৭৩)
“فمن جملة كلامه: قال تاج الشريعة في شرح الهداية: إن القرآن بالأجرة لايستحق الثواب لا للميت ولا للقارئ. وقال العيني في شرح الهداية: ويمنع القارئ للدنيا، والآخذ والمعطي آثمان. فالحاصل أن ما شاع في زماننا من قراءة الأجزاء بالأجرة لايجوز؛ لأن فيه الأمر بالقراءة وإعطاء الثواب للآمر والقراءة لأجل المال؛ فإذا لم يكن للقارئ ثواب لعدم النية الصحيحة فأين يصل الثواب إلى المستأجر! ولولا الأجرة ما قرأ أحد لأحد في هذا الزمان، بل جعلوا القرآن العظيم مكسباً ووسيلةً إلى جمع الدنيا – إنا لله وإنا إليه راجعون – اهـ”.
(الدرالمختار وحاشية ابن عابدين (رد المحتار)6/56 فقط واللہ اعلم
তার কথার সারাংশ হলো তাজুশ শরীআহ “শরহুল হিদায়াহ”-তে বলেছেন, যদি কুরআন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পড়া হয়, তবে তাতে মৃতের জন্যও সওয়াব নেই, পাঠকারীর জন্যও নেই । আল্-আইনী “শরহুল হিদায়াহ”-তে বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ার স্বার্থে কুরআন পড়ে, তাকে বাধা প্রদান করা হবে; আর যে দেয় ও নেয়, উভয়েই গুনাহগার।
সুতরাং উপসংহার হলো আমাদের যুগে যে প্রথা চালু হয়েছে, অর্থাৎ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কুরআনের অংশবিশেষ পড়া— এটি জায়েজ নয়। কারণ এতে কুরআন পাঠকারী অর্থ পাওয়ার উদ্দেশ্যে কুরআন পড়ে, আর আদেশদাতা সওয়াব পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে তাকে পড়তে বলে। যখন পাঠকারীর নিয়ত সঠিক নয়, ফলে তার জন্য সওয়াব হয় না, তখন অর্থপ্রদানকারীর পক্ষেও সওয়াব পৌঁছানোর প্রশ্নই আসে না।
আজকাল যদি টাকা না থাকে, কেউ কুরআন পড়তে রাজি হয় না; বরং তারা কুরআন শরীফকে উপার্জনের মাধ্যম ও দুনিয়া অর্জনের উপকরণ বানিয়ে নিয়েছে।
إنا لله وإنا إليه راجعون
(রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৫৬)
মূল : জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া, বিন্নুরী টাউন,
অনুবাদ ও সংক্ষেপ : মুফতি নুরুদ্দিন মাসরুর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top