ইসরাইল তার ভূরাজনৈতিক কার্যক্রম ও আদর্শিক অভিযাত্রায় ছয়টি বিপজ্জনক দর্শনের ওপর নির্ভর করে এগিয়ে চলেছে। এগুলো শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, বরং গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি স্বরূপ। একটি আপাত নিরীহ প্রশ্ন, ‘তুমি রাস্তা কেন পার হলে?’, যা সাধারণত ব্যঙ্গাত্মক রসিকতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, ইসরাইলি বাস্তবতায় তা রূপান্তরিত হয়েছে দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক প্রকল্পে। সেখানে ‘রাস্তা পার হওয়া’ মানে নিছক চলাচল নয়, বরং আধিপত্য, সার্বভৌমত্ব এবং বাস্তবতা পুনর্গঠনের প্রতীক।
১. আধিপত্যের পরিকল্পনা হিসেবে ‘ক্রসিং’
ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় দর্শনে সীমানার স্থিতিশীলতা কোনো লক্ষ্যমাত্রা নয়। বরং একটি রূপান্তরশীল মানচিত্রের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে ‘রাস্তা’ একটি প্রতীক, যার মাধ্যমে বসতি স্থাপন, সামরিক দখলদারি এবং মিডিয়া আখ্যানের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব আরোপ করা হয়। হিব্রু ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ যেমন ‘হারাহবা’ (সম্প্রসারণ) ও ‘রিবুনাট’ (সার্বভৌমত্ব), এই আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে ন্যায্যতা দেয়।
২. আইন ও রাজনৈতিক সীমা অতিক্রম : কারণ তা সম্ভব
ইসরাইলি রাজনীতি আইনের স্থিরতা মানে না; বরং একে প্রয়োজনে পুনর্গঠনযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখল থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের জাতি-রাষ্ট্র আইন পর্যন্ত রাষ্ট্রটি বারবার দেখিয়েছে- সীমা লঙ্ঘন কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং পরিকল্পিত নীতি। নেতানিয়াহুর মতে, যা আপনি মাটিতে চাপিয়ে দেন না, ইতিহাসে তা গণনা করা হয় না।’
৩. সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি : কেউ বাধা না দিলে অতিক্রম
ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রতিরক্ষার চেয়ে আগ্রাসী কৌশলে বেশি বিশ্বাসী। আভিভ কোচাভির মতো সামরিক নেতারা খোলাখুলিভাবে বলেছেন, তারা ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জন্য অপেক্ষা করে না’, বরং কৌশলগত সুবিধা অনুযায়ী আগ বাড়িয়ে আঘাত হানে। গাজা, সিরিয়া এবং লেবাননে অভিযানের মধ্য দিয়ে এই আক্রমণাত্মক মানসিকতা বাস্তবায়িত হয়েছে।
৪. বসতি স্থাপন : ধর্মতাত্ত্বিক প্রতিশ্রুতি
ধর্মীয় জায়নবাদীরা প্রতিটি ফিলিস্তিনি ভূমিকে বাইবেলের প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখে। বেজালেল স্মোট্রিচ-এর মতো রাজনীতিকেরা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনকে ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন এবং ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে চিত্রিত করে। এতে ভূমি দখলের প্রকল্পটি ধর্ম ও রাজনীতির সংমিশ্রণে পবিত্র আখ্যা পায়।
৫. নিরাপত্তা : ছায়া মুছে ফেলার অজুহাত
ইসরাইলের নিরাপত্তা ভাবনা একটি জাতীয় মানসিকতা, যেখানে সম্ভাব্য বিপদই সিদ্ধান্তের ভিত্তি। আমোস ইয়াদলিনের মতে, ‘যে প্রথমে আঘাত করবে না, তাকে সমাহিত করা হবে।’ এই নীতির আড়ালে ইসরাইল বৈরুত থেকে গাজা পর্যন্ত আক্রমণ চালায়, যেখানে প্রতিটি ছায়াই একটি হুমকি হিসেবে গণ্য হয়।
৬. মিডিয়া : আখ্যান দখলের ‘ক্রসিং’
ইসরাইলি মিডিয়া কেবল সংবাদ পরিবেশন করে না। বরং সরকার নির্ধারিত আখ্যানকেই প্রতিষ্ঠা করে। ২০২২ সালে সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিভ্রান্তিকর কভারেজ বা সিরিয়ার শিশুর ছবি ব্যবহার করে গাজা হামলাকে ন্যায্যতা দেয়ার প্রবণতা, সবই এই প্রকল্পের অংশ।
নৈতিকতার মুখোশ ও ফিলিস্তিনিরা
ইসরাইল তার নৈতিকতা ব্যাখ্যা করে ‘বড় মন্দকে ঠেকাতে ছোট মন্দকে স্বীকৃতি’ দিয়ে। এহুদ বারাক যেমন বলেছেন, ‘আলো ছড়াতে হলে কখনো বেদনাদায়ক কিছু করতে হয়।’ কিন্তু এই আলো আসলে কাদের জন্য? এই মূল্যবোধ নির্ধারণ করে কে?
ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে ইসরাইলি অবস্থান আরো স্পষ্ট। জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতেমার বেন-গভির বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনি যদি রাস্তা পার হতে চায়, তাকে স্বীকার করতে হবে যে রাস্তা আমাদের।’ ফিলিস্তিনিকে ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হিসেবে দেখা হয়, যার চলাচল, স্বপ্ন এবং পরিচয়, সবই নিয়ন্ত্রণাধীন।
রাস্তাটি কারো একার নয়
ইসরাইল বারবার রাস্তার একচ্ছত্র মালিকানা দাবি করলেও ইতিহাস দেখিয়েছে, বলপ্রয়োগ স্থায়িত্ব আনে না। ৭৫ বছর ধরে সহাবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করে যে দখলদারি মানসিকতা চালানো হচ্ছে, তা একটি স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যৎ নির্মাণে ব্যর্থ হবে।
রাস্তা পার হওয়া যদি ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বিপজ্জনক প্রকল্পে পরিণত হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, যাদের শুরু করার মতোই কোনো রাস্তা নেই, তাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?
সূত্র : আল জাজিরা




