গাজায় ইসরাইলি অবরোধের কারণে সৃষ্টি হওয়া মানবিক বিপর্যয় ও ব্যাপক অনাহার পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে কিছুটা হলেও সাড়া ফেলেছে। গাজা থেকে আসা ক্ষুধার্ত শিশুদের হৃদয়বিদারক ছবি এবং ত্রাণপ্রার্থীদের উপর হামলার খবরে কংগ্রেসের কিছু সদস্য ইসরাইলি নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন, যদিও সামগ্রিকভাবে ওয়াশিংটনের ইসরাইলপ্রীতির ধারা এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।
সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বাস্তবতা এটাই, ইতিমধ্যেই ২ লাখ ফিলিস্তিনি, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু, নিহত বা আহত হওয়ার পর, চরমপন্থী ইসরাইলি সরকার গাজার জাতিগত নির্মূল অভিযান পরিচালনার জন্য গণঅনাহার ব্যবহার করছে।’ তিনি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সরকারকে ‘নির্মূল অভিযান’ চালানোর জন্য দায়ী করেন।
ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেনও গাজায় মানবিক পরিস্থিতির চরম অবনতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রতিদিন, গাজার ভয়াবহতা নতুন, অকল্পনীয় গভীরতায় পৌঁছাচ্ছে।’ তিনি মানবিক সাহায্য গোষ্ঠীগুলিকে “ভাড়াটে সৈন্য দিয়ে প্রতিস্থাপন” করার জন্য নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দোষারোপ করেন।
কংগ্রেসম্যান জন গারামেন্ডি গাজায় ইসরাইলের ‘মানবিক সাহায্য প্রদানে বিপজ্জনক এবং ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতা’কে গণহত্যার শামিল বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, ‘ইসরায়েলের ফিলিস্তিনিদের পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ করার ক্ষমতা এবং উপায় রয়েছে… গাজায় খাবার না খাওয়ানো প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পছন্দ।’
ইসরাইলের একাধিক মন্ত্রী এবং কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে গাজায় খাদ্য প্রবেশ রোধ করাই তাদের লক্ষ্য, যাতে ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা যায়। ঐতিহ্যমন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহু বলেন, ‘এমন কোনও জাতি নেই যারা তার শত্রুদের খাবার দেয়… সরকার গাজাকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে।’
এই অবস্থায় কিছু প্রগতিশীল কংগ্রেস সদস্য ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ভাষায় গণহত্যার অভিযোগ এনেছেন। কংগ্রেসম্যান সামার লি বলেন, ‘চরম অনাহারে মানুষ রাস্তায় লুটিয়ে পড়ছে। ভয়াবহতার পর ভয়াবহতা। যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ইসরায়েলের তৈরি দুর্ভিক্ষ এবং গণহত্যার জন্য অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে।’
তবে অনেক আইনপ্রণেতা ইসরাইলকে সরাসরি দোষারোপ না করে হামাসের দিকেই দৃষ্টি ঘুরিয়েছেন এবং অস্পষ্ট বিবৃতি দিয়েছেন। কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং ‘একজন মা হিসেবে’ গাজার শিশুদের কষ্টে মর্মাহত হলেও ইসরাইলের পক্ষের প্রচারপত্রকেই সমর্থন করেন, যেমন – ‘ইসরাইল গাজায় ১.৮ মিলিয়ন টনেরও বেশি ত্রাণ প্রবেশ করিয়েছে, অথচ হামাস এখনও জিম্মি করে রেখেছে এবং চাঁদাবাজি করছে।’
একইভাবে, কংগ্রেসম্যান অ্যাডাম স্মিথ ও সিনেটর কোরি বুকার গাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানালেও ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু বলেননি। বরং তারা হামাসের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে ধরেন, যা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থা ইতিমধ্যেই অস্বীকার করেছে।
অনেকে সংকটের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকেই দায়ী করতে চেয়েছেন। হাউস মাইনরিটি লিডার হাকিম জেফ্রিস বলেন, ‘চলমান যুদ্ধক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি শিশু এবং বেসামরিক নাগরিকদের অনাহার এবং মৃত্যু অগ্রহণযোগ্য। ট্রাম্প প্রশাসনের এই মানবিক সংকটের অবসান ঘটানোর ক্ষমতা আছে।’ কংগ্রেসম্যান টিম কেনেডিও ট্রাম্পের ‘কৌশলগত ও নৈতিক ব্যর্থতা’কে দায়ী করেন।
একই সময়ে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান র্যান্ডি ফাইন গাজার অবরোধকে সমর্থন করে বলেন, ‘জিম্মিদের মুক্তি দিন। ততক্ষণ পর্যন্ত, অনাহারের মধ্যে থাকুন।’
গাজায় খাদ্য সংকটের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে শনিবার পর্যন্ত কমপক্ষে ১২৭ জন ফিলিস্তিনি অপুষ্টিতে মারা গেছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু ঘটে ওইদিনই। মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে সরাসরি ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়েছেন।
তবুও, মার্কিন কংগ্রেসের বড় অংশ ইসরাইলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে এবং সাম্প্রতিক সময়েও ইসরাইলকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তা অনুমোদন দিয়েছে।
সূত্র : আল জাজিরা




