দুর্ভিক্ষ কী?
দুর্ভিক্ষ বলতে বোঝায় একটি এলাকায় খাদ্যের চরম এবং ব্যাপক ঘাটতি, যার ফলে সেখানে ব্যাপক অপুষ্টি, অনাহার ও মৃত্যুও ঘটতে পারে। এটি সাধারণত কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা অবরোধের কারণে সৃষ্ট হয়। এতে স্বাভাবিক জীবনধারা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে।
জাতিসঙ্ঘ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি অঞ্চলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দুর্ভিক্ষপীড়িত’ ঘোষণা করতে হলে তিনটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। তা হলো, কমপক্ষে ২০ শতাংশ পরিবার চরম খাদ্য ঘাটতির শিকার হতে হবে; ৩০ শতাংশেরও বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগতে হবে; প্রতি ১০ হাজারজনের মধ্যে অন্তত দু’জন, অথবা প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে অন্তত চারজন প্রতিদিন অনাহার বা ক্ষুধাজনিত কারণে মারা যেতে হবে।
গাজায় কী ঘটছে?
গাজার পরিস্থিতি বর্তমানে এতটাই ভয়াবহ যে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং জাতিসঙ্ঘের কিছু মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এটিকে ‘দুর্ভিক্ষের সমতুল্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, মঙ্গলবার একদিনেই সেখানে অন্তত ১৫ জন মানুষ ক্ষুধার কারণে মারা গেছে।
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় খাদ্য, পানি এবং চিকিৎসাসামগ্রীর প্রবেশাধিকার দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত। ইসরাইলের আরোপিত অবরোধ, যুদ্ধের অব্যাহত ধ্বংসযজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রবাহের বাধাগ্রস্ততার ফলে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে।
তবুও কেন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি?
বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় দুর্ভিক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসার পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
-তথ্য সংগ্রহে বাধা
গাজার অভ্যন্তরে ইসরাইলের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত। ফলে যেসব সংস্থা সাধারণত এই তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে যেমন ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি), তারা সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে না।
রাজনৈতিক চাপ
জাতিসঙ্ঘের সাবেক কর্মকর্তা মনসেফ খানের মতে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনাও একটি বড় কারণ। উদাহরণস্বরূপ, গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা হলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আরো জোরালোভাবে সামনে আসবে; বিশেষ করে যদি ‘অনাহারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের’ অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
এই পরিস্থিতিতে ইসরাইলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেসকা আলবানিজ, যিনি ইসরাইলের সমালোচনা করেছেন, তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর করিম খান, যিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা চেয়েছেন, তাকেও নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি করা হয়েছে।
গাজায় বাস্তব অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। অনেক ক্ষেত্রেই তা জাতিসঙ্ঘের দুর্ভিক্ষ সংজ্ঞার উপযুক্ত। কিন্তু তথ্য সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভারসাম্যের কারণে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দুর্ভিক্ষ’ ঘোষণা আসেনি। ফলে সহায়তা ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম পরিমাণে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। যার মাশুল দিচ্ছে গাজার লাখ লাখ সাধারণ মানুষ।
সূত্র : আল জাজিরা




