গাজা শহর ও আশপাশের এলাকাগুলো দুর্ভিক্ষে ভুগছে। এই পরিস্থিতি পুরো উপত্যকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসঙ্ঘ-সমর্থিত বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষক সংস্থা।
শুক্রবার ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) জানায় যে গাজার ৫ লাখ ১৪ হাজার মানুষ – যা মোট ফিলিস্তিনিদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ – বর্তমানে দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন। সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা বেড়ে ৬ লাখ ৪১ হাজারে পৌঁছাতে পারে।
২২ মাসের যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে ইসরাইলি বাহিনী অবকাঠামো ও বেকারি ধ্বংস করেছে, ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিয়েছে এবং খাদ্য খুঁজতে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের হত্যা করেছে। আইপিসি জানিয়েছে, আফ্রিকার বাইরে এটাই প্রথমবার দুর্ভিক্ষের ঘোষণা এবং আগামী মাসের শেষে মধ্য ও দক্ষিণ গাজার দেইর এল-বালাহ ও খান ইউনিসেও এ অবস্থা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
জাতিসঙ্ঘ
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গাজার দুর্ভিক্ষকে “মানবসৃষ্ট বিপর্যয়, নৈতিক দোষারোপ এবং মানবতার ব্যর্থতা” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “মানুষ অনাহারে আছে, শিশুরা মারা যাচ্ছে, আর যাদের দায়িত্ব তারা ব্যর্থ হচ্ছে।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরাইলের আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইউএনআরডব্লিউএ প্রধান ফিলিপ লাজ্জারিনি বলেন, “মাসের পর মাস সতর্কীকরণ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখন দুর্ভিক্ষ নিশ্চিত হওয়ায় এটিকে থামানোর জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রয়োজন।”
জাতিসঙ্ঘের সাহায্য প্রধান টম ফ্লেচার ইসরাইলি নেতাদের বিরুদ্ধে অনাহারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ আনেন এবং নেতানিয়াহুকে “প্রতিশোধ বন্ধ করে সীমান্ত খুলে দেওয়ার” আহ্বান জানান।
ইসরাইল
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আইপিসির ঘোষণাকে “সম্পূর্ণ মিথ্যা” বলে আখ্যা দেন। তিনি দাবি করেন, “ইসরাইলের অনাহারের নীতি নেই” এবং গাজায় মানবিক সহায়তা সরবরাহের কথাও উল্লেখ করেন।
তবে মে মাসে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত জিএইচএফ জাতিসঙ্ঘের কাছ থেকে গাজায় খাদ্য সহায়তা বিতরণের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২ হাজারেরও বেশি সাহায্যপ্রার্থী নিহত হয়েছে।
হামাস
জাতিসঙ্ঘের ঘোষণার পর ফিলিস্তিনি দল হামাস অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানায়। অনলাইনে প্রকাশিত বিবৃতিতে তারা “খাদ্য, ওষুধ, পানি ও জ্বালানির জরুরি ও অবিচ্ছিন্ন প্রবেশের” অনুমতি দেওয়ার জন্য ক্রসিংগুলো খোলার আহ্বান জানায়।
হামাস ইসরাইলকে “অনাহারকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের” অভিযোগও করেছে।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, আইপিসি রিপোর্ট ও জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তাদের মন্তব্য প্রমাণ করে গাজার দুর্ভিক্ষ এখন “একটি প্রমাণিত সত্য” এবং এটি যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কয়েক ডজন ট্রাক ত্রাণ সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হলেও তা বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য, যা ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে “অপরাধী প্রমাণ করে”।
তারা আরও সতর্ক করে বলেছে, যে কোনও রাষ্ট্র বা সংস্থা এই অপরাধের প্রতি অন্ধ থাকলে তারাও আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় দায়ী হয়ে পড়বে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আইপিসি রিপোর্ট “দুর্ভিক্ষের ঘটনা সম্পর্কে ব্যাখ্যা ও জল্পনা-কল্পনার দরজা বন্ধ করেছে।”
তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক প্রভাবকে একত্রিত করা, যাতে দেরি হওয়ার আগেই দুর্ভিক্ষ ও আগ্রাসন বন্ধ করা যায়।”
পিএ আরও বলেছে, “ইসরাইলি দখলদারিত্ব গাজার মানব জীবনের সকল দিক ধ্বংস করছে এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।”
সৌদি আরব
সৌদি আরব গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বলেছে যে এই অবস্থা “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপর একটি দাগ হিসেবে থেকে যাবে”।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজার দুর্ভিক্ষ ইসরাইলি দখলদারিত্বের পুনরাবৃত্ত অপরাধের জন্য প্রতিরোধ ও জবাবদিহিতার অভাবের সরাসরি ফলাফল।
তারা জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদকে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করে দুর্ভিক্ষ বন্ধ ও ইসরাইলের “গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ” রোধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
কুয়েত
কুয়েত গাজায় বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে ইসরাইলের “অনাহার, নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির নীতি”র নিন্দা করেছে।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরাইলের এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
কুয়েত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছে গাজায় জরুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করতে এবং ইসরাইলকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)
জিসিসি মহাসচিব জসেম মোহাম্মদ আলবুদাইভি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরাইলের উপর চাপ সৃষ্টি করে গাজায় অবাধ মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, আইপিসির দুর্ভিক্ষ ঘোষণা প্রমাণ করে ইসরাইল গাজায় বিপজ্জনক ও অমানবিক অনাহারনীতি অনুসরণ করছে।
যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড ল্যামি দুর্ভিক্ষ ঘোষণাকে “নৈতিক অবমাননা” ও “মানবসৃষ্ট বিপর্যয়” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, “গাজায় যথেষ্ট সাহায্যের অনুমতি না দেওয়া ইসরাইলি সরকারের অস্বীকৃতি এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।”
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
অ্যামনেস্টির সিনিয়র পরিচালক এরিকা গুয়েভারা রোসাস বলেছেন, “গাজার দুর্ভিক্ষ ইসরাইলের ইচ্ছাকৃত অনাহার নীতির ফল।”
তিনি যোগ করেন, “মানবিক সাহায্য বাধাগ্রস্ত করা, অবকাঠামো ধ্বংস এবং বেসামরিক হত্যাকাণ্ড ইসরাইলের চলমান গণহত্যারই অংশ।”
রেড ক্রস
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) জানিয়েছে, আইপিসির রিপোর্ট “বিধ্বংসী ও পূর্বাভাসযোগ্য” ছিল।
তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরাইলের দায়িত্ব গাজার জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা।
অক্সফাম
অক্সফাম বলেছে, গাজার দুর্ভিক্ষ ঘোষণা তাদের বহু মাসের পর্যবেক্ষণকেই নিশ্চিত করেছে।
সংস্থাটির নীতি প্রধান হেলেন স্টভস্কি বলেন, “গাজার দুর্ভিক্ষ ইসরাইলের অবরোধ, সহিংসতা এবং অনাহারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সরাসরি ফল।”
তিনি যোগ করেন, “জুলাই মাসে দুর্ভিক্ষের সতর্কতা দেওয়া সত্ত্বেও ইসরাইল খাদ্য ও সাহায্য সরবরাহে বাধা দিয়ে চলেছে।”
ইসলামিক রিলিফ
মানবিক দাতব্য সংস্থা ইসলামিক রিলিফ আইপিসির ঘোষণাকে “সমগ্র বিশ্বের জন্য লজ্জাজনক” বলে অভিহিত করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের দলের সদস্যরা প্রতিদিন গাজার মানুষের চোখের সামনে অনাহারে মৃত্যুর দৃশ্য দেখছে এবং শিশুদের জীবন্ত কঙ্কালে পরিণত হতে দেখছে। বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়েছে, বিশ্ব যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয় তবে আরও বহু প্রাণ হারাবে।
সিএআইআর (আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস কাউন্সিল)
আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস কাউন্সিল (CAIR) শুক্রবারের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, গাজার এই দুর্ভিক্ষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন কংগ্রেসকে ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত সমর্থন বন্ধ করতে বাধ্য করবে। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, “এই দুর্ভিক্ষ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয় – এটি ইসরায়েলের নৃশংস অবরোধ, খাদ্য ব্যবস্থার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস এবং মানবিক সাহায্যের পদ্ধতিগত বাধার সরাসরি পরিণাম। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো মাসের পর মাস ধরে এই বিপদের ব্যাপারে সতর্ক করে আসছিল।”
মার্সি কর্পস
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাহায্য গোষ্ঠী মার্সি কর্পসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তজাদা ডি’ওয়েন ম্যাককেনা জাতিসঙ্ঘের ঘোষণাকে “ভয়াবহ হলেও অবাক করার মতো নয়” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি কয়েক মাসের ইচ্ছাকৃত সাহায্য অবরোধ, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পানি ব্যবস্থার ধ্বংস এবং অবিরাম বোমাবর্ষণের সরাসরি ফলাফল। এটি সম্পূর্ণরূপে মানবসৃষ্ট, প্রতিরোধযোগ্য এবং অযৌক্তিক।”
ম্যাককেনা আরও জানান, মার্সি কর্পসের কর্মীরা নিজেরাই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের নিজস্ব দলের সদস্যদের অপুষ্টির শিকার হতে দেখছি। তারা খাবারের লাইনে দাঁড়াচ্ছে, নিজেদের খাবার এড়িয়ে তাদের সন্তানদের খাওয়াচ্ছে এবং প্রতিদিন রুটি ও পানি সংগ্রহের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে।”
সূত্র : আল জাজিরা




