গাজা, ইসরাইল, হামাস, গাজায় যুদ্ধবিরতির দাবি, ইসরাইলি সেনা কর্মকর্তা, ইসরাইলি ফিল্ড কমান্ডার,গিডিয়নের রথ,ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে বন্দি বিনিময় চুক্তি

গাজায় যুদ্ধবিরতির দাবিতে ইসরাইলি সেনা কর্মকর্তাদের বিদ্রোহ

গাজা যুদ্ধের বাস্তব অবস্থা নিয়ে ইসরাইলের অভ্যন্তরে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ইসরাইলি ফিল্ড কমান্ডারদের একটি দল অভিযোগ তুলেছে, গাজায় ‘আসন্ন বিজয়’ সম্পর্কে সরকার জনসাধারণের সাথে প্রতারণা করছে এবং বাস্তব পরিস্থিতি গোপন করছে। তাদের দাবি, গাজায় লড়াই বছর বছর ধরে চললেও হামাসকে পরাজিত করা সম্ভব নয়।

ইসরাইলের প্রধান দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনোথে শুক্রবার প্রকাশিত একটি বিস্তৃত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিফ অফ স্টাফ ইয়াল জামির নিজেই গত মার্চ মাসে স্বীকার করেছেন যে হামাসকে পরাজিত করার প্রধান লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। তিনি আরো জানান, গাজার প্রকৃত পরিস্থিতি গোপন রাখতে গণমাধ্যম কাভারেজের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে।

গিডিয়নের রথ : একটি আর্থিক ও কৌশলগত ব্যর্থতা

ইয়েদিওথ আহরোনোথের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় চলমান লড়াইকে ‘গিডিয়নের রথ’ নামে নামকরণ করে একে নতুন সামরিক অভিযান হিসেবে চালানো হলেও এই পদক্ষেপ যথাযথ ছিল না। ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে বন্দি বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়ন করাই বরং যৌক্তিক হতো।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুই মাসের এই অভিযানের জন্য ৬০ বিলিয়ন শেকেল অতিরিক্ত যুদ্ধ তহবিল বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘অপারেশন গিডিয়ন একটি পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান, যা সম্পূর্ণ আলাদা বাজেটের দাবি রাখে। কিন্তু ২০২৫ সালের চূড়ান্ত বাজেটে এই পরিকল্পনার কোনো স্থান ছিল না।’

হামাসের শক্ত ঘাঁটিগুলো অক্ষত

প্রতিবেদনে হামাসের তিনটি প্রধান কেন্দ্র এখনো অব্যাহতভাবে সক্রিয় বলে বলা হয়েছে- গাজা শহর, খান ইউনিসের উপকণ্ঠ এবং মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ ও নুসাইরাত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এই অঞ্চলগুলো মোকাবেলায় আইডিএফকে অন্তত দু’টি পূর্ণ ডিভিশন মোতায়েন করতে হবে এবং এতে বহু মাস লড়াই চলবে।’

একজন ময়দানি ও একজন কর্মী পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা খুব ধীরে এবং তীব্র ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। আল-আত্তারায় আমরা একটি ব্রিগেড পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ইরানের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং অন্যান্য ফ্রন্টে চাপের কারণে সেটি হঠাৎ সরিয়ে নেয়া হয় এবং হামাস দ্রুত ফিরে আসে।’

সেন্সরশিপ ও স্বচ্ছতার অভাব

ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ গাজার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ কাভারেজ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ‘যুদ্ধ গোপন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, এমন এক সময়ে যখন জনগণের সমর্থন অনেকটাই হ্রাস পেয়েছিল।’

সেনাবাহিনীর যুদ্ধ-কভারেজে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে ফিল্ড কমান্ডার ও যোদ্ধাদের জনসাধারণ থেকে আলাদা রাখা হয়েছে। প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিদেশে গ্রেফতার এড়াতে ইসরাইল ফিল্ড কমান্ডারদের পরিচয় গোপন রেখেছে।

হামাসের সক্ষমতা অটুট

‘যদি যুদ্ধ আগামী মাসগুলোতে শেষ হয়, তবে হামাস থাকবে’ প্রতিবেদনে এই ভাষায় স্পষ্টভাবে বলা হয়। সেনাবাহিনী নেতজারিম করিডোর থেকে আংশিক প্রত্যাহার করেছে এবং প্রায় ৮ লাখ ফিলিস্তিনি গাজা শহরে ফিরে গেছে, যার ফলে প্রায় ১০ হাজার হামাস যোদ্ধা ও কমান্ডার আবার সংগঠিত হতে পেরেছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘আমরা কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক খুঁজে পেয়েছি, যা ‘গাজা মেট্রো’ নামে পরিচিত এবং তেল আবিবের রেড লাইন মেট্রোর চেয়েও বড়।’ এতে বলা হয়, এখনো কোনো ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে ধরা সম্ভব হয়নি।

এক হামাস কমান্ডারকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘হামাস নামক এই গর্তের গভীরতা এতটাই বেশি যে একে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে এক দশক পর্যন্ত লড়াই করতে হতে পারে।’

সেনাবাহিনীর মানবসম্পদ সঙ্কট ও ক্ষয়ক্ষতি

প্রতিবেদনে আইডিএফের রিজার্ভ বাহিনীর মধ্যে ‘তীব্র ক্ষয়ক্ষতির’ কথা বলা হয়েছে। তরুণ সৈন্যদের বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ, তাদের মৃত্যুকে রাষ্ট্র ‘কম মূল্যবান’ হিসেবে বিবেচনা করছে। এই নীতির ফলেই ‘মোরাগ অক্ষ’ থেকে সেনা প্রত্যাহারের মতো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যা ভবিষ্যতের লড়াইকে কঠিন করে তুলবে বলে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top