গাজার বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যে তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি প্রতিবাদকারী সংগঠন—প্যালেস্টাইন অ্যাকশন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এ গ্রুপের কিছু সদস্য ব্রিটিশ বিমানঘাঁটি RAF ব্রিজ নর্টনে অনুপ্রবেশ করে দুটি এয়ারবাস ভয়েজার বিমানে স্প্রে পেইন্ট করার ঘটনায় যুক্তরাজ্য সরকার এবার এই ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন গ্রুপটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করতে উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকারি উদ্যোগ ও আইনি পদক্ষেপ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার সংসদে জানিয়েছেন, ৩০ জুন তিনি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করার আইনি প্রস্তাব আনবেন। এটি পাস হলে, এই সংগঠনের সদস্যপদ রাখা বা সমর্থন প্রকাশ করাও অবৈধ হয়ে উঠবে, এবং অপরাধের দায়ে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
এটি হবে যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো একটি ডাইরেক্ট অ্যাকশন গ্রুপকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকাভুক্ত করা, যা কার্যত আল-কায়েদা ও আইএসের মতো সংগঠনের সঙ্গে একই শ্রেণিতে স্থান করে নেবে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশন: উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত প্যালেস্টাইন অ্যাকশন শুরুতেই ইসরায়েলের বৃহত্তম অস্ত্র প্রস্তুতকারী ইলবিত সিস্টেমস-এর লন্ডন সদর দপ্তরে হামলা চালিয়ে পরিচিতি পায়। এর পর সংগঠনটি “ইসরাইলি সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের কর্পোরেট সমর্থকদের” লক্ষ্য করে অফিস ও কারখানায় রঙ ছুড়ে কিংবা যন্ত্রপাতি ভেঙে প্রতিবাদ করে আসছে।
ইলবিত সিস্টেমস ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। গ্রুপটির দাবি অনুযায়ী, তাদের কার্যক্রমের ফলে বহু সংস্থা ইলবিত-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হয়, এবং বার্কলেস ব্যাংক ১৬,০০০ শেয়ার ত্যাগ করে। এমনকি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও ২৮০ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি চুক্তি বাতিল করে।
বিচার, আইন এবং সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ
এই গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া ঘটনা হচ্ছে ‘ফিল্টন ১৮’ নামক অভিযানে জড়িত ১৮ জন সদস্যের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ। ২০২৩ সালের আগস্টে তারা ব্রিস্টলে ইলবিত-এর একটি গবেষণা কেন্দ্রে হামলা চালায় এবং গাজার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ড্রোন ভেঙে ফেলে। ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ মিলিয়ন পাউন্ড।
পরে পুলিশ আরও ১২ কর্মীকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে আটক করে। যদিও শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে সন্ত্রাসবাদ বাদ দেওয়া হয়, তবু তারা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে রিমান্ডে থেকে যাচ্ছেন, যা জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকেও সমালোচিত হয়েছে।
সরকার বনাম সলিসিটরদের অবস্থান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কুপার বলেন, প্যালেস্টাইন অ্যাকশন ‘লক্ষ লক্ষ পাউন্ডের সম্পত্তি ক্ষতি’ করেছে, এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে। তিনি এ সিদ্ধান্তকে ‘সরকার, পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থার যৌথ প্রমাণ-ভিত্তিক বিশ্লেষণ’-এর ফল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, প্যালেস্টাইন অ্যাকশন একটি প্রচারণাভিত্তিক সংগঠন, যার অনেক কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, র্যালি ও লাল রঙ ছুঁড়ে প্রতীকী বিরোধ পর্যন্ত সীমিত। আইনজীবী লরা ও’ব্রায়ান এবং সাইমন পুক বলেন, অধিকাংশ মামলায় যে সম্পত্তি ক্ষতির কথা বলা হচ্ছে, তা ‘তেমন গুরুতর নয়’ এবং অনেক সময় তা ‘সহজেই ধুয়ে ফেলা যায়’।
আইনি পূর্ব নজির ও বৈপরীত্য
২০০৩ সালে ফেয়ারফোর্ড ফাইভ নামে পরিচিত পাঁচজন কর্মী আরএএফ বিমানঘাঁটিতে অনুপ্রবেশ করে ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে সামরিক সরঞ্জাম নাশকতা করে। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারের মক্কেল, যিনি তখন ব্যারিস্টার হিসেবে যুক্তি দেন—এই পদক্ষেপ ছিল যুদ্ধাপরাধ প্রতিরোধে ন্যায্যতা ভিত্তিক। আজ সেই কেয়ার স্টারমার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করতে চাইছেন।
নিষেধাজ্ঞার আইনি কাঠামো
২০০০ সালের সন্ত্রাসবাদ আইনের আওতায় ৮১টি সংগঠন ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ। আইনে ‘সন্ত্রাসবাদ’-কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এমন কর্মকাণ্ড হিসেবে যা সহিংসতা, গুরুতর সম্পত্তি ক্ষতি বা জনসাধারণের জীবনে হুমকি সৃষ্টি করে। নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে আবেদন করা গেলেও, অতীতে এমন চ্যালেঞ্জের সংখ্যা ছিল অল্প।
তবে এই ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তে আইনি চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা অনেক বেশি, কারণ প্যালেস্টাইন অ্যাকশন কোনও সশস্ত্র সংগঠন নয়, বরং একটি প্রতিবাদ-ভিত্তিক প্রচারমুখী গ্রুপ, যাদের অনেক পদক্ষেপ শান্তিপূর্ণ এবং প্রতীকী।
গাজায় চলমান যুদ্ধ, পশ্চিমা অস্ত্র কোম্পানিগুলোর ভূমিকা এবং যুক্তরাজ্যের সামরিক অংশগ্রহণ নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক বিতর্ক তীব্রতর, তখন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব একটি গভীর রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এটি শুধু প্রতিবাদ ও নিরাপত্তার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না, বরং যুক্তরাজ্যে সুশীল প্রতিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও এক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।
সূত্র : মিডল ইস্ট আই




