গাজা সিটি, ইসরাইল, গাজা, জাতিসংঘ

যুদ্ধবিরতি আলোচনা সত্ত্বেও গাজা দখলের অনুমোদন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছেন, তিনি গাজা শহর দখলের পরিকল্পনায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন এবং একই সাথে হামাসের সাথে আলোচনা পুনরায় শুরু করবেন, তবে তা হবে ‘ইসরাইলের কাছে গ্রহণযোগ্য শর্তাবলী’ অনুসারে। নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা এসেছে এমন সময়ে যখন প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে অবসান ঘটানোর আহ্বান আন্তর্জাতিক মহলে বাড়ছে।

বৃহস্পতিবার গাজার কাছে সৈন্যদের উদ্দেশে বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, তিনি গাজা শহরের ঘনবসতিপূর্ণ কেন্দ্র দখল, প্রায় ১০ লক্ষ মানুষকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা এবং ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ধ্বংসের পরিকল্পনা অনুমোদনে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, ‘একই সাথে আমি আমাদের সমস্ত জিম্মিদের মুক্তি এবং ইসরাইলের কাছে গ্রহণযোগ্য শর্তাবলী অনুসারে যুদ্ধ শেষ করার জন্য অবিলম্বে আলোচনা শুরু করার নির্দেশ জারি করেছি। আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে আছি।’

ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের পর নেতানিয়াহু জানান, কয়েক দিনের মধ্যেই গাজা শহরে ব্যাপক অভিযান শুরু হতে পারে। ইতোমধ্যেই ইসরাইলি বাহিনী সেখানে আক্রমণ তীব্র করেছে। গত ১০ দিনে ইসরাইলি ট্যাঙ্ক গাজা শহরের কাছে পৌঁছালে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

এর আগে হামাস জানিয়েছিল, তারা কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় আনা একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে। প্রস্তাবটি ইসরাইল গ্রহণ করলে আক্রমণ রোধ করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, গাজায় আটক ১০ জন জীবিত বন্দী ও ১৮ জন মৃতদেহ মুক্তি এবং বিনিময়ে ইসরাইলি কারাগারে আটক প্রায় ২০০ ফিলিস্তিনি বন্দী মুক্তির কথা বলা হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধবিরতির পর স্থায়ী সমঝোতার জন্য আলোচনার প্রস্তাবও এতে অন্তর্ভুক্ত।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী ৬০ হাজার রিজার্ভ সৈন্য মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, পাশাপাশি আরও ২০ হাজার সৈন্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।

আল জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা নেতানিয়াহুর এ ঘোষণাকে ‘আগুনের মুখে আলোচনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘লড়াই থামানো হবে না। গণহত্যায় কোনও বিরতি থাকবে না। ইসরাইল যখন কয়েক ডজন, সম্ভবত শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করছে এবং গাজার দক্ষিণে দশ লক্ষ ফিলিস্তিনিকে স্থানান্তর করছে, তখন হামাসকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইসরাইল এখন সব শর্ত নির্ধারণ করছে, ওয়াশিংটন থেকেও তাদের সবুজ সংকেত রয়েছে।’

শুধু বৃহস্পতিবার সকালেই গাজা জুড়ে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৪৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে জিএইচএফ ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে গুলি চালিয়ে নিহত হয়েছেন ১৬ জন ত্রাণপ্রার্থী। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুইজন অনাহারে মারা গেছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি অবরোধজনিত ক্ষুধায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭১, যাদের মধ্যে ১১২ জন শিশু।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, গাজার ৯০ শতাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তারা সতর্ক করেছে, আরও বাস্তুচ্যুতি ঘটলে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। ফিলিস্তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গাজা শহর দখলের ইসরাইলি প্রচেষ্টাকে ‘মৃত্যুদণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরাইল দক্ষিণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা স্থানান্তরের মাধ্যমে গাজার চিকিৎসা খাতের অবশিষ্ট কাঠামোকেও ধ্বংস করছে। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই পদক্ষেপে দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে এবং রোগী ও আহতদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে।’

গাজার অনেক পরিবার ইতোমধ্যেই উপকূলবর্তী এলাকায় বা ছিটমহলের দক্ষিণাঞ্চলে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। ৬৭ বছর বয়সী রাবাহ আবু ইলিয়াস রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা এক তিক্ত পরিস্থিতির মধ্যে আছি। বাড়িতে থেকে মারা যাব, নাকি অন্য কোথাও গিয়ে মারা যাব—এই যুদ্ধ চলতে থাকলে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা নেই।’

এদিকে, মধ্য গাজার দেইর এল-বালাহতে ইসরাইলি বিমান হামলায় একটি তাঁবু শিবির ধ্বংস হয়ে গেছে, যেখানে অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। হামলার আগে ইসরাইলি সেনারা পালিয়ে যেতে সতর্ক করেছিল বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা। কিন্তু হামলার পর শিশু-সহ পরিবারগুলোকে ধ্বংসস্তূপ থেকে অল্প কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করতে দেখা গেছে।

উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত মোহাম্মদ কাহলৌত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, তাদের মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল সবকিছু ফেলে পালিয়ে যাওয়ার জন্য। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা বেসামরিক মানুষ, সন্ত্রাসী নই। আমরা কী করেছি আর আমাদের শিশুরা কী করেছে, আবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার জন্য?’

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top