গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতির অচলাবস্থায় পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। এবার ইসরাইলি বন্দীদের পরিবার সরাসরি হামাসের সাথে যোগাযোগ করেছে বলে জানা গেছে।
মিডল ইস্ট আই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দীদের পরিবারগুলো প্রতিনিধির মাধ্যমে হামাসের সাথে যোগাযোগ করছেন। তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভাগ্য সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন।
পরিবারগুলোর আশঙ্কা, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে সম্ভাব্য চুক্তিকে ভেস্তে দেয়ার চেষ্টা করছেন। সূত্র অনুসারে, হামাসের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন যে তারা যুদ্ধবিরতি এবং বন্দী বিনিময় চুক্তি নিয়ে আন্তরিক এবং দায়িত্বশীল মনোভাব দেখিয়েছেন। তবে ইসরাইলি পক্ষের একগুঁয়েমির কারণে অগ্রগতি সম্ভব হচ্ছে না।
হামাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা গাজায় যুদ্ধ থামানোর জন্য দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আলোচনার সময় তারা নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে। কিন্তু ইসরাইল তাদের ভূমিকা পাল্টে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, গাজা ধ্বংস করা এবং এর জনসংখ্যাকে বাস্তুচ্যুত করার মতো নীতিতে অনড় থেকেছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে একটি তিন-পর্যায়ের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও মার্চ মাসে ইসরাইলের আচরণে তা ভেঙে পড়ে। ইসরাইল একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে যায় এবং গাজায় আবারো বোমাবর্ষণ শুরু করে। হামাস দাবি করেছে, তারা প্রথম পর্যায়ের সব শর্ত মেনে চলেছে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তাদের অভিযোগ, ইসরাইল শত শত চুক্তিভঙ্গ করেছে। যেমন বাফার জোনের বাইরে সেনা মোতায়েন, ১৩২ জন বেসামরিক মানুষের হত্যা, পুনর্গঠন সামগ্রী আটকে রাখা এবং ফিলাডেলফিয়া করিডোরে দখলদারি।
হামাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধের কোনো নিশ্চয়তা ছাড়াই ইসরাইল বন্দীদের একাংশকে মুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু পূর্ণ চুক্তিতে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। হামাসের মতে, গাজায় এখনো প্রায় ২০ জন জীবিত এবং ৩০ জনের বেশি মৃত ইসরাইলি বন্দী রয়েছেন।
সূত্রগুলো বলছে, হামাস ইসরাইলকে দায়ী করছে বন্দীদের মুক্তি বিলম্বিত করার জন্য এবং তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার জন্য, যেখানে একযোগে সব বন্দী মুক্তির বিনিময়ে যুদ্ধ থামানোর কথা ছিল।
এছাড়া হামাস একটি স্বাধীন ও পেশাদার প্রশাসনের হাতে গাজা শাসনের দায়িত্ব হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে এবং নিজেদের কোনো প্রশাসনিক ভূমিকা না রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, আলোচনা এখন কার্যত অচলাবস্থায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য অনুযায়ী আলোচনা ভালো চলছে। কিন্তু বাস্তবে কাতারের দোহায় হামাস আলোচকরা একে অগ্রগতিহীন বলে বিবেচনা করছেন।
চারটি মূল বিষয়ে অন্তত দু’টি, বিশেষ করে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তা বিতরণের প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনার দিক পরিবর্তন করে কেবল বন্দী বিনিময় নিয়ে কথা বলার প্রস্তাব এসেছে।
হামাস জানিয়েছে, তারা আলোচনায় কোনো আপত্তি করেনি। বরং বেশ কয়েকটি প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। কিন্তু ইসরাইল চুক্তিতে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে গাজার ৩৬ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ৬ লাখেরও বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যুত রাখতে চায়।
গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও হামাসের দাবি, তারা আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। তারা বারবার যুদ্ধ থামিয়ে বন্দী মুক্তির প্রস্তাব দিলেও ইসরাইল তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত ২১ মাসের গাজা যুদ্ধের ফলাফল ভয়াবহ। এ সময় ৫৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক। নিহতদের মধ্যে রয়েছে ১,৪০০ স্বাস্থ্যকর্মী, ২৮০ জন জাতিসঙ্ঘ কর্মী এবং অন্তত ২২৮ জন সাংবাদিক, যা জাতিসঙ্ঘ ও গণমাধ্যম ইতিহাসে নজিরবিহীন।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইলি বন্দীদের পরিবারের হামাসের সাথে সরাসরি যোগাযোগ, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এবং নেতানিয়াহুর কৌশল নিয়ে সংশয়—সব মিলিয়ে গাজা সংকটের একটি নতুন মাত্রা প্রকাশ করছে। আলোচনা কতদূর গড়াবে বা আদৌ সমাধান আসবে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত।
সূত্র : মিডল ইস্ট আই




