গাজায় চলমান যুদ্ধ কেবলমাত্র সামরিক সঙ্ঘর্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর গভীর প্রভাব পড়েছে ইসরাইলি সমাজের মানসিক স্বাস্থ্যে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ের চাপে ইসরাইলি নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা, বিষণ্ণতা, পিটিএসডি ও আত্মহত্যার প্রবণতা বিপজ্জনক হারে বেড়ে চলেছে। সরকার যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করলেও সম্প্রতি সরকারি ও বেসরকারি নানা পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে দেশটির সমাজজুড়ে এক অভূতপূর্ব মানসিক বিপর্যয়ের চিত্র।
ইসরাইলের হেল্পলাইন ‘এরান’ বলছে, তাদের কাছে প্রতিদিন আসা কলের ৪৮ শতাংশই মানসিক সমস্যাজনিত, যা সংস্থাটির ভাষায় এক ‘মানসিক সুনামি’। ৭ অক্টোবরের পর থেকে তারা প্রায় ৩ লাখ কল পেয়েছে, যার মধ্যে ৪০ হাজার এসেছে সেনা সদস্য ও তাদের পরিবার থেকে এবং ৫৮ হাজার কিশোর-কিশোরীদের কাছ থেকে। একইভাবে ‘সাহার’ নামক আরেকটি মানসিক সহায়তা সংস্থায় কিশোরদের কল ৪৩০ শতাংশ বেড়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ঘুমের সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি, অ্যালকোহল ও ধূমপান, মনোযোগহীনতা এবং একাগ্রতার অভাব নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ৩২০০ জন মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। পিটিএসডি-তে আক্রান্ত সেনা সদস্যের সংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ। মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। জাতীয় বিমা কর্তৃপক্ষ বলছে, অন্তত ৬৫ হাজার নাগরিক স্নায়ুবিক রোগে ভুগছেন।
নারীদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে। গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবের সময়ে থাকা নারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রসব-পরবর্তী বিষণ্ণতায় আক্রান্ত। এই মানসিক চাপ এতটাই তীব্র যে কিছু অঞ্চলে স্নায়ু ও হৃদযন্ত্রের রোগ দ্বিগুণ হয়েছে। ‘আসুতা আশদোদ’ হাসপাতালের মতে, যুদ্ধ-সংক্রান্ত মানসিক চাপ থেকে হৃদরোগের হার বেড়েছে দ্বিগুণ এবং ঘুমের ওষুধ ও মানসিক ওষুধের চাহিদা বেড়েছে ৩১ শতাংশ।
সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনেও যুদ্ধের ছাপ স্পষ্ট। ৫৩ শতাংশ মানুষ সামাজিক সম্পর্ক কমিয়ে দিয়েছেন, ৪৮ শতাংশ মনোযোগ কমে যাওয়ার কথা বলেছেন এবং ৪৫ শতাংশ মানুষ বলছেন, তারা দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দুর্বল অনুভব করছেন। এক জরিপ অনুযায়ী, ৬৭ শতাংশ ইসরাইলি নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না এবং ৬৫ শতাংশ বলছেন, তাদের দেশপ্রেম ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হ্রাস পেয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সেনাবাহিনীর মধ্যে। অনেক সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে সহকর্মীদের মৃত্যু, আহত হওয়া বা পুড়ে যাওয়ার দৃশ্য ভুলতে পারছেন না। তাদের অনেকেই বেসামরিক জীবনে ফিরে গিয়েও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। স্ত্রী-সন্তান বা পরিবারের সাথে কথাও বলতে পারছেন না, যা তাঁদের মানসিক বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত বহন করে।
এই মানসিক সঙ্কটকে অনেক বিশেষজ্ঞ যুদ্ধ-পরবর্তী ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন। যুদ্ধের ক্লান্তি নয়, বরং এটি এক নিষ্ঠুর যুদ্ধনীতি ও নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরানোর প্রতিক্রিয়া। ইতিহাস বলছে, এমন রক্তের ঋণ শোধ হয় আতঙ্ক, সঙ্কট ও সমাজের ভাঙনের মধ্য দিয়ে, যা আজকের ইসরাইলি সমাজে প্রতিফলিত হচ্ছে।
সূত্র : আল জাজিরা, আরবি পোস্ট ও অন্যান্য




