গাজা সিটির ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা ইসরাইলি বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছেন, কারণ সেনাবাহিনী এলাকাটি দখল ও জাতিগতভাবে নির্মূল করার জন্য একটি বড় আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর ফলে জরুরি কর্মীরা আবাসিক জেইতুন পাড়ায় আটকা পড়া মানুষদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না।
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, শুক্রবার জেইতুনে আহতদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা জরুরি যানবাহনগুলিতে ইসরাইলি সেনাবাহিনী গুলি চালিয়েছে। একই সময়ে ইসরাইলি কোয়াডকপ্টার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির হুমকি দিয়ে লিফলেট ফেলেছে। বাসিন্দাদের পূর্ব পাড়ার কিছু অংশ ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে, যেখানে শত শত বাড়িঘর সম্প্রতি ধ্বংস হয়ে গেছে।
আল জাজিরার তারেক আবু আযুম দেইর এল-বালাহ থেকে জানিয়েছেন, ইসরাইল ভারী কামান, ড্রোন ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে এবং গাজা সিটির চারটি পাড়া দিনরাত অবিরাম বোমাবর্ষণের মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মানুষকে এই এলাকায় ফিরে আসতে দেওয়া হবে না তা নিশ্চিত করার জন্য বেসামরিক জীবনকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হচ্ছে।’
গাজায় বন্দীদের পরিবার ও তাদের সমর্থক, ইসরাইলি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সমালোচনা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু গাজার বৃহত্তম নগর কেন্দ্র দখল এবং লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক কেন্দ্রীভূত অঞ্চলে স্থানান্তরের জন্য চাপ দিচ্ছেন।
এদিকে সামরিক বাহিনী গাজা শহরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ছিটমহলের অন্যান্য অংশেও আক্রমণ চালিয়ে গেছে। এতে ৪৪ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৬ জন ত্রাণপ্রার্থী ছিলেন। চিকিৎসা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তারা পরিবারের জন্য খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন। হামলার মধ্যে দুটি হাসপাতালে আক্রমণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতালে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন, যা পূর্বে বহুবার বোমাবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। এছাড়া দেইর এল-বালাহর আল-আকসা হাসপাতালে ইসরাইলি ড্রোনের ঝাঁকের আগেই একটি বিস্ফোরণে অন্তত দুইজন নিহত হন।
৪৬ দিন ধরে ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ
আল জাজিরা আরবি জানিয়েছে, গাজা শহরের পূর্বাঞ্চলীয় তুফাহ পাড়ায় এক নারী তার ভাইয়ের মৃতদেহ এবং বাবার কিছু দেহাবশেষ উদ্ধার করেছেন ধ্বংসস্তূপ থেকে। তিনি জানান, জুনের শেষ দিকে বিমান হামলায় বাড়িটি ধ্বংস হয়েছিল এবং তখন ৩১ জন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন। সরঞ্জামের অভাবে এতদিন মৃতদেহ উদ্ধার সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা যা সম্মুখীন হচ্ছি তা অত্যধিক। অত্যধিক নির্যাতন ও নিপীড়ন। নির্যাতন, ক্লান্তি এবং ব্যথা।’
ক্ষুধা, পানিশূন্যতা ও তাপপ্রবাহ
মানবিক সহায়তা বিতরণ কেন্দ্রগুলির কাছেও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, শুক্রবার ১৬ জন নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস জানিয়েছে, মে মাসের শেষ থেকে গাজায় সাহায্য সংগ্রহের সময় কমপক্ষে ১,৭৬০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৯৯৪ জন জিএইচএফ সাইটের আশেপাশে এবং ৭৬৬ জন সরবরাহ কনভয়ের পথে নিহত হয়েছেন। বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর হাতে ঘটেছে। মার্কিন নিরাপত্তা ঠিকাদাররাও সাহায্যপ্রার্থীদের উপর গুলি চালিয়েছে।
এদিকে, ইসরাইলি অবরোধজনিত অনাহারে আরও একটি শিশুর মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, গাজা শহরের প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন এখন অপুষ্টিতে ভুগছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অনাহারে মৃতের সংখ্যা ২৪০-এ পৌঁছেছে, যার মধ্যে ১০৭ জন শিশু।
জাতিসংঘ বলেছে, গাজায় প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশ করতে হবে অনাহার রোধে। তবে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, বৃহস্পতিবার তারা ৩১০টি ট্রাকের অনুমতি দিয়েছে এবং জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংস্থা ২৯০টিরও বেশি ট্রাক সংগ্রহ ও বিতরণ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ও ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলি বলছে, আসলে প্রয়োজনীয় ত্রাণের মাত্র এক-ষষ্ঠাংশ গাজায় প্রবেশ করছে, তাও আবার ইসরাইলি-সমর্থিত দলগুলির লুটপাটের শিকার হচ্ছে।
ক্ষুধার পাশাপাশি গাজার মানুষ তীব্র পানিশূন্যতা ও চরম গরমে ভুগছেন। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে এবং মানুষ দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছেন। বাস্তুচ্যুত এক ব্যক্তি হোসনি শাহীন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, ‘এটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশুদের পেটে ব্যথার কারণ হয়। আপনার সন্তানরা যখন এটি পান করে তখন আপনি নিরাপদ বোধ করেন না।’
সূত্র : আল জাজিরা




