গাজীপুরে মাদরাসা ছাত্রীকে ধর্ষণ, পুলিশের অবস্থান প্রশ্নের মুখে

গাজীপুরে মাদরাসা ছাত্রীকে ধর্ষণ, পুলিশের অবস্থান প্রশ্নের মুখে

আবু সাঈদ
গাজীপুরে হিন্দু যুবক কর্তৃক মাদরাসা ছাত্রীকে ধর্ষণ নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ তাদের অফিসিয়াল ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছে। পোস্টটি ইতোমধ্যে তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এই বিষয়ে কয়েকটি পয়েন্ট ফাইন্ড আউট করা যায়-
এক.
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ১৩ বছরের ‘শিশু’কে যৌন নিপীড়ন করা অপরাধ। এতে তার সম্মতি থাকলেও ধর্ষণ বলে গণ্য হবে। কিন্তু বিবৃতিতে এই অপরাধকে ধর্ষণ আখ্যা না দিয়ে প্রেম নাম দিয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে বিষয়টিকে হালকা করার প্রয়াস পেয়েছে। প্রশ্ন হলো, পুলিশ বিষয়টি এড়িয়ে গেল কেন? তারা তো আইনের রক্ষক- আইন জানারই কথা। স্বভাবই এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, তবে পুলিশ কার স্বার্থে আইন ভঙ্গে প্রণোদিত হচ্ছে? ধর্ষক বেঁচে গেলে পুলিশেরই বা বেনিফিশিয়ারি কী? আজ ভিক্টিম যদি মাদরাসা ছাত্রী না হয়ে কোনো নামীদামী স্কুলের ছাত্রী হতেন, তাহলে পুলিশ এমন পক্ষপাত করতে পারতো?
দুই.
বিবৃতিতে পুলিশ ওই মাদরাসা ছাত্রীর বিশদ পরিচয় উল্লেখ করেছে। অথচ এক্ষেত্রে ভিক্টিমের পরিচয় গোপন রাখাই ছিল তার নাগরিক অধিকার। পুলিশকে এই অধিকার খর্ব করার অনুমতি দিলো কে? ভিক্টিম যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে যতটুকু না হ্যারেজমেন্টের শিকার হয়েছে, এভাবে পরিচয় প্রকাশ পাওয়া কি তার চেয়ে কম? এখন পুলিশ যে ভিক্টিমের ক্ষতি করল, এর ক্ষতিপূরণ কি তারা দেবে?
অবশ্য উন্নত দেশে হলে মামলা দিলে বড় ধরনের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং আরো অনেক কাণ্ড কারখানাও ঘটতো।
তিন.
বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, এই মেয়ে আগেও ওই হিন্দু ছেলের সাথে একাধিকবার পালিয়েছে। অথচ মেয়ের মা-বাবা জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। তাহলে পুলিশ কার বক্তব্যের ভিত্তিতে এতটা নিশ্চিতভাবে দাবি করতে পারল? ভিক্টিমের বাবা-মাকে কেন জিজ্ঞেস করল না?
চার.
পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসত্য বয়ানে প্রকাশ করায় বিভ্রান্তি তৈরী হচ্ছে।’ প্রশ্ন হলো, বিবৃতিতে বলা হচ্ছে, তদন্ত চলমান। তাহলে পুলিশ কিভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ষণের দাবিকে অসত্য বয়ান বলে দাবি করছে? এই পক্ষপাতই তো ইঙ্গিত দেয় যে তদন্ত সঠিক পথে অগ্রসর হচ্ছে না। তাহলে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে কী লাভ? এটি তো জনগণ থেকে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হলো। দু’দিন পরে অন্য ইস্যুর ভিড়ে যখন এই ইস্যু গৌন হয়ে যাবে, তখন অপরাধীকে ছেড়ে দেয়া হবে। তাহলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কিভাবে তৈরি হবে?
পাঁচ.
যদি কোনো মাদরাসার ছাত্র বা ছাত্রী কোনো বিষয়ে ভিক্টিম হয়, তাহলে তারা একাকী হয়ে পড়ে। তাদের পাশে না মাদরাসাকে পাওয়া যায়, না মিডিয়া বা মানবাধিকার কর্মী কিংবা অন্য কেউ। সেজন্য এই বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিৎ।
একজন স্কুল ছাত্র ভিক্টিম হলে তার সহপাঠিরা প্রতিবাদ করে, কিন্তু আমরা কেন পারি না? জেনারেল ব্যাকগ্রাউন্ডের কেউ অন্যায়ের শিকার হলে তার জন্য কতজনের কত ধরনের বিবৃতি নজরে পড়ে, অথচ মাদরাসা ছাত্রদের জন্য কারো অর্থবহ নড়াচড়া চোখে পড়ে না। সেজন্য এই বিষয়টিকে নিয়ে আমাদের ভাবা উচিৎ। আমরা কিন্তু চাইলেই সহজে অনেক কিছু করতে পারি। আমাদের করা উচিৎ।
ছয়.
যখন কোনো মাদরাসা ছাত্র বা ছাত্রী ভিক্টিম হয়, তখন আমরা অনলাইনে কিছু অ্যাক্টিভিটি দেখাই। দুদিন পরে অন্য ইস্যুর ভিড়ে সেটি ভুলে যাই। আর এর জন্য সরকার, মানবাধিকার কর্মী কিংবা সুশীল সমাজ কথা না বলার জন্য দায়ী করি। আমার কাছে মনে হয়, এভাবে অন্যের উপর দায় চাপানো ঠিক নয়। তারা আপনার আদর্শ লালন করে না, তবে আপনার জন্য কেন তারা বলবে? তাদের নীতিই হলো, নিজের জন্য বলা, আর অন্য মতাদর্শের পক্ষে গেলে চুপ থাকা। তাই এভাবে দায় না চাপিয়ে নিজেদেরই এমন ইনফ্লুয়েন্সার তৈরি করা উচিৎ।
লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top