আব্দুল্লাহ আল ফারুক
ছাত্রজীবনে আমরা নূর হুসাইন কাসেমি রহ. এর সাথে খুব বেশি ঘনিষ্ট ছিলাম। বিশেষ করে আমরা যারা হুজুরের খাদেম হতাম, তাদের সঙ্গে তিনি জীবন, সংসার, পড়াশুনা, সিয়াসাত, জাতীয় ঘটনাপ্রবাহ- এগুলো নিয়ে কথা বলতেন। হুজুর খুব বেশি কথা বলতেন, এমন নয়। তবে বিছানায় শোওয়া, চা খাওয়া, কোথাও একসাথে সফরে যাওয়া, ঘুমের আগে মাথা টিপে দেওয়া- এই মুহূর্তগুলোতে হুজুর এমন কিছু কথা বলতেন, যা জীবনে চলার পথে অনেক উপকারী হতো।
ইনশাআল্লাহ, ইচ্ছে আছে সেই কথাগুলো একসময় মলাটবদ্ধ করব। আজ প্রাসঙ্গিকভাবে সেরকম একটা কথা মনে পড়লো।
আমার সুস্পষ্ট মনে পড়ে- একদিন হুজুর আমাদেরকে বলেছিলেন, ‘বাজি, সীমিত পরিসরে ছাত্ররাজনীতিরও দরকার আছে। যেসব মাদরাসায় ছাত্র রাজনীতি নেই, সেখানকার ছাত্ররা অতি সহজে গুমরাহ ও বাতিল ফেরকার খপ্পরে পড়ে।’
আজ থেকে অন্তত পঁচিশ বছর আগে শোনা। কিন্তু কথাগুলো আমার পরিষ্কার মনে আছে। আমি জানি না, হুজুরের এই কথাগুলো তাঁর অন্য কোনো ছাত্র বা খাদিমের মনে আছে কি-না। তবে আমার মনে আছে।
বাংলাদেশে যতগুলো ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠন আছে, সবগুলোই বেশ পুরনো। কিন্তু আপনি খোঁজ নিয়ে দেখুন, তাদের ছাত্রসংগঠনগুলো তত বেশি পুরনো নয়। অধিকাংশ সংগঠন পরবর্তীকালে যুগচাহিদার প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
কেন প্রতিষ্ঠা করতে হয়?
ছাত্রদের হেফাজতের স্বার্থে। কীভাবে হেফাজত হয়, সেটাও খুলে বলছি।
সাধারণত এই সংগঠনগুলো স্বাধীন হয় না। তারা দলের মুরুব্বিদের সরাসরি নির্দেশনার অধীনে পরিচালিত হয়। বর্তমান সময়ের অনেক শীর্ষ যোগ্য নেতা সেসব ছাত্র সংগঠনেরই উপহার। নাম বললে, তালিকা লম্বা হবে। আমি সেদিকে যাচ্ছি না।
এই ছাত্র রাজনীতি হয় একান্তই সীমিত পরিসরে। সরাসরি উসতাদদের তত্ত্বাবধানে। সার্বিক কার্যক্রম বড়রা মনিটরিং করে থাকেন। অনেক সময় জাতীয় ইস্যুতে তাৎক্ষণিক জনবলের প্রয়োজন পড়ে। এটা ছাত্র রাজনীতি ছাড়া কখনই সম্ভব নয়।
আমরা যারা নূর হুসাইন কাসেমি রহ. এর শিষ্যত্ব পেয়েছি দারসে ও রাজনীতির ময়দানে, তার জন্যে আমরা মহান আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া আদায় করি। ছাত্র রাজনীতির কল্যাণে হযরতের কাছে পাওয়া দীক্ষা ও মধ্যপন্থা আমাদের মানস গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ছাত্রজীবনে অনিয়ন্ত্রিত রাজনীতি যেমন ক্ষতিকর, তেমনি তালিবুল ইলমদের অনিয়ন্ত্রিত তাবলীগি মেহনতও ক্ষতিকর। ছাত্রজীবনে পড়াশুনার চেয়ে অধিক তাবলীগ করে বেড়ানো এমন কিছু কিছু ছাত্র আজ সাদপন্থীদের শূরা। আপনারা চিনে থাকবেন।
যেমন ধরুন, বইপাঠ অত্যন্ত উপকারী; কিন্তু ছাত্রজীবনে কেউ যদি উসতাযের নেগরানি ছাড়া ‘যাহাই পায়, তাহাই গিলতে শুরু করে’ তাহলে তার অনিয়ন্ত্রিত পাঠের বদহজম হতে বাধ্য। এমন নজির আমাদের সমকালেও রয়েছে। নাম বলতে চাচ্ছি না। আপনারা নিশ্চয়ই চিনবেন।
এজন্যে ছাত্র জীবন থেকে যেভাবে উসতাদদের তত্ত্বাবধানে সীমিত পর্যায়ে তাবলীগি মেহনত করা দরকার, উসতাদদের সিলেকশনে সিলেবাসের বাইরের কিছু বইপত্র পড়া দরকার, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে সীমিত পর্যায়ে ইসলামি রাজনীতি করাও দরকার। মনে রাখতে হবে, আমাদের রাজনীতি কখনই সেক্যুলার ধারার রাজনীতির মত নয়।
উসতাযদের নেগগানিতে এই সীমিত পর্যায়ের রাজনীতি চর্চার ফলে একদিকে দেশ ও বহির্বিশ্বের গতি-প্রকৃতির ব্যাপারে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। অন্যদিকে সমকালীন প্রলুব্ধকর গুমরাহ ফেরকাদের মুখরোচক কথার খপ্পর থেকেও বাঁচা যায়।
আজ এ বিষয়ে লেখার কারণ হলো, গতকাল হযরত মাওলানা আবদুল মালেক সাহেবের অন্য বক্তব্যের মাঝপথে চলে আসা একটি খণ্ডিত বক্তব্য নিয়ে অনেকেই অনেক রকম মন্তব্য করছে। অনেকেই লাগামহীনভাবে ছাত্ররাজনীতির মুণ্ডুপাত করছে। আমার কাছে তাদের সেই নিন্দাত্মক কথাগুলো অতিরঞ্জন মনে হলো। তাই ভাবলাম, এ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা না এলে একপেশে আলোচনা সাধারণ মানুষকে মিসগাইড করবে।
লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে গৃহীত




