ছাত্র শিবিরের কৌশলের কাছে ছাত্রদল শিশু সংগঠন মাত্র

সৈয়দ শামছুল হুদা

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের এমনসব বহুমুখি কর্মকান্ড রয়েছে যা বিশ্লেষণ করলে ছাত্রদলকে রাজনৈতিক ময়দানের শিবিরের তুলনায় স্রেফ একটি শিশু সংগঠন হিসেবেই মনে হবে। ঢাবি এবং জাকসু নির্বাচনের পর এই বিষয়টি হয়তো অনেকের কাছেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক এটাই সত্য যে, জুলাই বিপ্লবে ছাত্রশিবিরের অংশগ্রহণ ছিল অগ্রগণ্য। আন্দোলনে সাধারণ জনতা ছিল, বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী, সংগঠন ছিল। কিন্তু আন্দোলনের ম্যাকানিজমে শিবিরের ধারে কাছেও কেউ ছিল না।

বিশেষ করে হাসিনার পতন নিশ্চিত করতে তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, কৌশল, গোপনীয়তা, ত্যাগ অতুলনীয়। যাদের কৌশল ধরতে ভারত বাংলাদেশের গোয়েন্দারা পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। কওমীর আলেম বলি আর চরমোনাই পীরের বীরত্ব দেখি, সবই ছাত্রশিবিরের ম্যাকানিজমের কাছে আত্মসমর্পন মাত্র। বিএনিপি দীর্ঘ ১৬ বছরে অনেক আন্দোলন করেছে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে বটে, কিন্তু বিএনপির আন্দোলনে গভীরতা, গোপনীয়তা ছিল না, তৃণমূল থেকে নিয়ে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত নিপুণ সংযোগ ছিল না। আজকে যতই জুলাই বিপ্লবে সমন্বয়কদের কথা বলা হোক, মূলত: তাদের অধিকাংশই শিবির।

শিবির এর প্রতিটি কর্মী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদেরকে বুলেট মারলেও আপনি তাদের সাংগঠনিক কোনো গোপন তথ্য বের করতে পারবেন না। কোনো ছাত্রশিবিরকে অন্যদিকে মোটিভিটেড করতে পারবেন না। কারণ, তারা প্রতিনিয়ত এসব চাপ এবং মোটিভিশনের মাধ্যমেই এগিয়ে যায়। তাদের মনস্তাত্বিক শক্তি যে কোনো সংগঠনের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগামি। তাদের রয়েছে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তথা নেটওয়ার্ক।

সারা পৃথিবীতে উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষারত তাদের হাজার হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে, যেটা অন্য কোনো সংগঠন কল্পনাও করতে পারে না। দেশের বাইরে তাদের অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে মালয়েশিয়া, তুরস্ক, ইংল্যান্ড, সৌদী আরবসহ প্রায় সকল দেশ।

দেশের অভ্যন্তরে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৪ সালের পর থেকে আন্দোলন, সংগ্রাম, সংগঠন সকল ক্ষেত্রে অনেকটাই চোখের আড়ালে চলে যায় ছাত্রশিবির। আওয়ামীলীগের দুঃসহ নির্যাতন, জুলুম থেকে বাঁচতে এবং প্রতিবেশি দেশটির গোয়েন্দা জাল থেকে দূরে থাকতে তাদের সবকিছুই চ্যাঞ্জ করে ফেলতে হয়। সম্প্রতি জাকসু নির্বাচনের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কতটা কৌশলে তারা কাজ করতো, তার কিছুটা নমুনা সামনে আসতে শুরু করেছে। আওয়ামীলীগের শেষ ১০ বছরে তাদের এই আত্মগোপনে যাওয়ার ফলে সাংগঠনিক শক্তি কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে তা ইতিমধ্যেই প্রকাশ হওয়া শুরু করেছে।

সেই তুলনায় ছাত্রদলকে শিশু সংগঠনই বলা চলে। ছাত্রদলের মধ্যে ছাত্রদের নিয়ে প্রশিক্ষণমূলক কোনো কর্মসূচীই নেই। একাডেমিক কোনো গবেষণা নেই। তাদের মধ্যে সাংগঠনিক কোনো নেটওয়ার্ক নেই। ভার্সিটিতে কোনো একটি সংগঠনে থাকতে হবে , তাই ছাত্রদলে থাকা। লীগের পুরোটা সময়েই দেখা গেছে, যখনই ছাত্রদলের কমিটি গঠনের সময় এসেছে, তখনই তারা পল্টন অফিসের সামনে গন্ডগোল পাকিয়েছে। ছাত্রদলের অনেক সিনিয়র নেতা চাঁদাবাজিতে ব্যর্থ হয়ে মানবেতর জীবন কাটিয়েছে। কিন্তু দলকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা কখনোই দৃশ্যমান হয়নি। বিদেশে তাদের অবস্থান নেই। তারা প্রশিক্ষিত কোনো জনশক্তিই তৈরি করতে পারেনি। ছাত্রলীগ যেই ধাঁচের রাজনীতি করে, ছাত্রদল সেটারেই অনুসরণ করে মাত্র। আদর্শগত পার্থক্য সামান্যই। ব্যবহারগত কিছুটা পার্থক্য অবশ্য আছে। ছাত্রলীগের মতো ছাত্রদল এতটা নির্মম নয়।

দেশে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকে, আবারও যদি লীগের সহজ উত্থান না ঘটে, তাহলে ছাত্রশিবিরকে থামানোর কোনো শক্তি বাংলাদেশে আপাতত নেই। ঢাবির নির্বাচনের পর আর কোনো নির্বাচনেই তাদেরকে হারানোর কোনো শক্তি বাংলাদেশের কোনো সংগঠনের নেই। ছাত্র শিবিরের কাছে যেই পরিমাণ প্রশিক্ষিত জনশক্তি আছে, কোনো সংগঠনের এত প্রশিক্ষিত জনশক্তি নেই। তারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, দুর্বল করা, প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার ব্যাপারে যতটা এক্সপার্ট আর কেউ সেই তুলনাই তুলনীয় নয়।

ছাত্রদল যদি আদর্শ এবং নৈতিকতা দিয়ে ছাত্রশিবিরকে মোকাবেলা করতে চায়, তাহলে তাদেরকে অনেক বেশি ত্যাগ স্বীকারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। একাডেমিক গবেষণা বাড়াতে হবে। সকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদেরকে লেজুড়বৃত্তিমূলক রাজনীতি থেকে বের হয়ে ছাত্রবান্ধব কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। শক্তিপ্রয়োগ, সন্ত্রাস দিয়ে প্রতিপক্ষকে দমনের নাম রাজনীতি নয়। বিশেষকরে ছাত্র রাজনীতির নামে আমরা বিগত সময়ে যা দেখেছি, তা জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত করে।

আজকে ছাত্র শিবির যে রাজনৈতিক কারিশমা দেখাচ্ছে, তার অনেক কিছুই এক সময়ের প্রভাবশালী সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ধার করা। ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিটি কর্মী এভাবেই গড়ে উঠতো। ৭১ এর আগে-পরের ছাত্র ইউনিয়ন ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী সংগঠন। ছাত্রলীগের দাপটের সামনে ছাত্র ইউনিয়ন অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়ে। শেখ মুজিবের শাসনামলে জাসদের শক্তিকে নির্মূল করা হয়। ছাত্র ইউনিয়নের ছাত্র-ছাত্রী হতো কঠিন মোটিভেটেড। মতিয়া চৌধুরী, ইনু, রাশেদ খান মেনন থেকে নিয়ে লাখ লাখ কর্মী ছাত্র ইউনিয়ন থেকে উঠে এসেছে যারা পরবর্তীতে প্রতিটি সরকারের আমলেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও আগামী ৫০ বছর ছাত্রশিবিরের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অপ্রতিন্দ্বন্ধী প্রভাব থাকবে। কমবেশি সব দলেই তাদের অনুপ্রবেশ ঘটবে। ইতিমধ্যেই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছে যে, ৬টি দলে ইতিমধ্যেই তাদের অনুপ্রবেশ ঘটে গেছে। আর নতুন করে এর সংখ্যা বাড়ানোর দরকার নেই। যদিও এনসিপিকে উদ্দেশ্য করেই তার এই বক্তব্য, তথাপি এর মধ্যে একটি অন্য বার্তাও আছে।

কওমী মাদরাসাভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ছাত্র সংগঠনতো কোনোভাবেই এদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। শিবিরের বিচরণ কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনা পার হয়ে এখন কওমীর দৌঁড়গুড়ায়। আর কওমীদের বিচরণ শুধু সীমিত কয়েকটি কওমী মাদরাসায় মাত্র। শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, আন্দোলন, কমিউনিকেশন কোনো ক্ষেত্রেই শিবিরের বারান্দাতে পৌঁছার ক্ষমতাও কওমীভিত্তিক সংগঠনগুলোর নেই।

তবে আমি মনে করি, ছাত্র শিবিরের এসব দিক অন্যান্য সংগঠনগুলোরও অনুসরণ করা উচিত। ছাত্র শিবিরের ভালোটা গ্রহণ করতে তো কোনো দোষের কিছু নেই। এ পথে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন কিছুটা নকল করে এগিয়ে যাচ্ছে।

সবশেষে বলবো, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল দেশের একটি বড় দলের অঙ্গসংগঠন। তারা পেশিশক্তির দিকে মনযোগ না দিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্র শিবিরের রাজনৈতিক কৌশলকে যেন গুরুত্ব দেয়। দেশের মানুষ ছাত্র রাজনীতির নামে হানাহানি দেখতে চায় না। খুনাখুনি, রক্তপাত আর দেখতে চায় না। জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতা, প্রতিন্দ্বন্ধিতা দেখতে চায়। আমরা কি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতা আগামীতে দেখতে পাবো?

লেখক : অনুচিন্তক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top