ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে এক গভীর জনসংখ্যাগত সঙ্কটে পড়েছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইইউ-তে মৃত্যু হয়েছে ৪.৮২ মিলিয়ন মানুষ এবং জন্ম হয়েছে মাত্র ৩.৫৬ মিলিয়ন। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় ১.৩ মিলিয়ন মানুষের প্রাকৃতিক জনসংখ্যা হ্রাস ঘটছে। এই প্রেক্ষাপটে অভিবাসনই একমাত্র উপায়ে ইউরোপের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০২৪ সালে ইইউতে নেট ইতিবাচক অভিবাসনের সংখ্যা দাঁড়ায় ২.৩ মিলিয়নে, ফলে মোট জনসংখ্যা বেড়ে হয় ৪৫০.৪ মিলিয়ন। ইউরোস্ট্যাট ও দ্য টেলিগ্রাফ মনে করে, ইউরোপের শ্রমবাজারে ঘাটতি ও প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এই অভিবাসন প্রবণতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইউরোপের বহু দেশ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এই পরিস্থিতি অভিবাসনবিরোধী জনমত ও ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানকে প্রতিফলিত করছে।
২০১০ সালে ইইউ-তে বিদেশে জন্মগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা ছিল ৪১ মিলিয়ন, যা ২০২৪ সালে দাঁড়ায় ৬৩ মিলিয়নে—বিশেষ করে জার্মানি ও স্পেনে এই বৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য। COVID-19 মহামারির সময় জনসংখ্যা হ্রাস পেলেও, অভিবাসনের মাধ্যমে সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে উঠেছে। মাল্টা জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে শীর্ষে, বিপরীতে হাঙ্গেরি ও লাটভিয়া সবচেয়ে বেশি হ্রাসের সম্মুখীন হয়েছে।
ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা এই সঙ্কটের একটি উদাহরণ। ২০২২ সালে দেশটিতে অভিবাসীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৭০ লক্ষে, যা মোট জনসংখ্যার ১০.৩ শতাংশ। লা ক্রোইক্স-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জন্মহার হ্রাস ও মৃত্যুহার বৃদ্ধির কারণে অভিবাসন ছাড়া ফ্রান্সের জনসংখ্যা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
অভিবাসন বনাম জনসংখ্যাগত সঙ্কট : ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দ্বন্দ্ব
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, ইউরোপের জনসংখ্যাগত সঙ্কট মোকাবিলায় বৃহত্তর অভিবাসনই একমাত্র কার্যকর পথ, যদিও এটি তথাকথিত “মহান প্রতিস্থাপন” তত্ত্ব প্রচারকারী অতি-ডানপন্থীদের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ফ্রান্সে জন্মহার কমে যাওয়া এবং প্রথম সন্তানের গড় বয়স বেড়ে যাওয়ায় জনসংখ্যা হ্রাস হচ্ছে। ২০২২ সালে দেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধির ৭৫ শতাংশ–এরও বেশি এসেছে অভিবাসনের মাধ্যমে। যদি এই নেট অভিবাসন অব্যাহত থাকে, তবে ফ্রান্স তার জনসংখ্যা ধরে রাখতে পারবে, নতুবা সঙ্কট ঘনিয়ে আসবে।
গার্ডিয়ান–এর একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২১০০ সাল পর্যন্ত অভিবাসন অব্যাহত থাকলে ইউরোপ কিছুটা স্থিতিশীল থাকতে পারবে, কিন্তু অভিবাসন ছাড়া ইতালির জনসংখ্যা অর্ধেকে, জার্মানির ৮৩ থেকে ৫৩ মিলিয়নে, এবং ফ্রান্সের ৬৮ থেকে ৫৯ মিলিয়নে নেমে আসবে।
বর্তমানে ইউরোপে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্ব জনগণের হার ২১ শতাংশ। অভিবাসন সীমিত থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে এটি ৩৬ শতাংশ-এ পৌঁছাতে পারে, যার ফলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সঙ্কুচিত হবে, পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বেড়ে যাবে এবং করের বোঝা বাড়বে।
অর্থনীতিবিদ অ্যালান ম্যানিং মনে করেন, কম জন্মহারের কারণে শিশু ও শিক্ষার চাহিদা হ্রাস পাবে এবং বৃদ্ধদের যত্নের জন্য অধিক কর্মী প্রয়োজন হবে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা অভিবাসী চিকিৎসক ও নার্সদের উপর নির্ভর করছে।
গ্রামীণ ইউরোপে চিত্র আরও ভয়াবহ। দক্ষিণ ইতালির ক্যামিনির মতো অনেক গ্রামে জনসংখ্যা হ্রাসে বাসস্থান পরিত্যক্ত ও স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু একটি শরণার্থী পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে সেখানে জনসংখ্যা ৩৫০-এ পৌঁছেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং স্কুল পুনরায় চালু হয়েছে।
বিশ্লেষক সেরেনা ফ্রাঙ্কোর মতে, অভিবাসীরা শুধু জনসংখ্যা রক্ষা করছে না, বরং নতুন দক্ষতা ও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করছে। ইউরোপের জন্য অভিবাসন এখন কেবল বিকল্প নয়, বরং এক অপরিহার্য বাস্তবতা।
অভিবাসন : সমন্বিত সমাধানের একটি অংশমাত্র
দ্য গার্ডিয়ান–এর তথ্যমতে, বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন যে, অভিবাসন কোনও “জাদুকরী সমাধান” নয়। বরং এটি একাধিক নীতির সমন্বয়ে সমাধানের একটি উপাদান।
তারা ব্যাখ্যা করেন যে কেবল অভিবাসনের উপর নির্ভর করে সঙ্কট সমাধান সম্ভব নয়। কারণ প্রয়োজনীয় অভিবাসনের মাত্রা বাস্তবসম্মত নয় এবং তা সামাজিক চাপ তৈরি করতে পারে। এর পাশাপাশি চাই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অবসর বয়স বাড়ানো, পেনশন ও কর সংস্কার।
এছাড়া, অভিবাসীরা যেন অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশে অভিবাসীদের কর্মসংস্থান হার কম, ফলে তারা সামাজিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা সঙ্কটকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইউরোপের জনসংখ্যাগত সঙ্কট এক জটিল বাস্তবতা, যার সমাধানে অভিবাসন গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হলেও একমাত্র সমাধান নয়। রাজনৈতিক ইচ্ছা, নীতিগত ভারসাম্য, এবং সমাজে সমন্বয়ের ক্ষমতা নির্ধারণ করবে ইউরোপ এই সঙ্কট কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারবে।
সূত্র : আল জাজিরা




