জাতিসঙ্ঘ অফিস স্থাপন, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার হাইকমিশন, ড. সরোয়ার হোসাইন,

জাতিসঙ্ঘ অফিস স্থাপনে কেন অনিবার্য হবে আদর্শিক সঙ্ঘাত

ড. সরোয়ার হোসাইন

১. মানবাধিকার কমিশন কেন নিজস্ব অফিস খুলতে চায়?

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ের নিজস্ব অফিস স্থাপনের পেছনে প্রাথমিক উদ্দেশ্য মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ ও সহায়তা হলেও এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য আরো গভীর। বর্তমানে এ কার্যালয়ের নিজস্ব কোনো ফান্ডিং নেই। ফলে একটি অফিস স্থাপন করতে পারলে কমিশন পশ্চিমা দাতা সংস্থার কাছ থেকে সরাসরি অর্থ সহায়তা পাবে। এর ফলে তারা নিজস্ব লোকবল ও রিসোর্স গড়ে তুলতে পারবে এবং বৃহৎ পরিসরে তথ্যানুসন্ধান ও প্রতিবেদন প্রকাশ করতে সক্ষম হবে। অথচ অফিস ছাড়াও তারা কাজ করতে পারছে—তার প্রমাণ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ সংক্রান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন-সংক্রান্ত প্রতিবেদন।

তবে মূল প্রশ্ন হলো, এই অফিস স্থাপন কী নিছক একটি প্রযুক্তিগত বিষয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে আদর্শগত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য?

২. জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার ধারণা : একটি সাংস্কৃতিক সঙ্ঘাত

মানবাধিকার শব্দটি শুনতে যতটা উদার ও সার্বজনীন মনে হয়, বাস্তব প্রয়োগে তা অনেক সময়ই স্থানীয় সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আইনের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার ধারণা—বিশেষ করে নারী অধিকার, LGBTQ+ অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মৌলিক স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো দেশীয় ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশের মানবাধিকার ধারণা মূলত ইসলামী মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং জাতীয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। তাই, আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হলেও বাংলাদেশ স্থানীয় বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মানবাধিকার নীতিমালা অনুসরণ করে। বিশেষ করে কাদিয়ানী ইস্যুতে জাতিসঙ্ঘের অবস্থান এবং বাংলাদেশের ধর্মীয় আবেগ ও সংবিধানের মাঝে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, তা একটি বড় উদাহরণ। এই দ্বন্দ্ব বিশ্বজনীন মানবাধিকার বনাম রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্ঘাতকে প্রকট করে তোলে।

৩. এলজিবিটি এজেন্ডা : প্রতিশ্রুতি না দিয়েও পরোক্ষ অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশে LGBTQ+ সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড আইনত নিষিদ্ধ এবং সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। ফলে জাতিসঙ্ঘ বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সরাসরি এলজিবিটি শব্দ ব্যবহার না করে শব্দের কৌশলে কাজ করে থাকে। যেমন

-“Gender identity”, “non-discrimination”, “vulnerable group” প্রভৃতি শব্দের আড়ালে LGBTQ+ বিষয়কে উপস্থাপন;
-প্রশিক্ষণ কর্মশালায় এলজিবিটি বিষয় ‘লিঙ্গ পরিচয়’ এর অংশ হিসেবে রাখা;
-LGBTQ+ এনজিওগুলোকে “সিভিল সোসাইটি স্ট্রেংথেনিং” প্রকল্পের আওতায় সহযোগিতা;
-স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা ইস্যুর অন্তরালে এজেন্ডা বাস্তবায়ন।

উগান্ডা, গিনি কিংবা নেপালের মতো দেশেও এই ধরনের চুক্তিভিত্তিক গোপন কার্যক্রমের নজির রয়েছে। ফলে প্রতিশ্রুতি না থাকলেও বাস্তবে তারা একটি আদর্শগত রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করে।

৪. মানবাধিকার কমিশনের মুখোশ ও এলজিবিটি এজেন্ডার বাস্তবায়ন

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাঠামো অনেক সময় একটি আদর্শিক প্লাটফর্মে রূপ নেয়, যার আড়ালে কাজ করে পশ্চিমা উদারবাদী চিন্তা, বিশেষ করে এলজিবিটি এজেন্ডা। “Leave no one behind” কিংবা “inclusive society”—এমন স্লোগান দিয়ে মূলত যৌন আচরণভিত্তিক একটি এজেন্ডা সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

২০১৩ সালে UNFPA বাংলাদেশে সমকামী অধিকার বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে যৌন শিক্ষা ও সমকামিতাবিরোধী আইন বাতিলের দাবিতে সক্রিয় হয় জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন সংস্থা। ২০১৫ সালে UNDP ‘LGBTQ Inclusion Index’ তৈরির উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায়, ২০১৯ সাল থেকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের জন্য LGBTQI সূচক তৈরির প্রকল্পে কাজ করছে, যার আওতায় পরিবার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে LGBTQI অন্তর্ভুক্তির পরিমাপ করা হচ্ছে।

এভাবে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাঠামো ব্যবহার করে একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শিক প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনের অফিস স্থাপন প্রশ্নটি নিছক প্রশাসনিক নয়; এটি একটি আদর্শগত ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয় সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আইনের সাথে সংঘাতে লিপ্ত একটি বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার কাঠামো যদি পরোক্ষভাবে LGBTQ+ বা কাদিয়ানী মতাদর্শের প্রসার ঘটায়, তবে তা বাংলাদেশের সামাজিক স্থিতি, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তাই এ বিষয়ে জনসচেতনতা ও নীতিগত সতর্কতা জরুরি।

বিভিন্ন গুণীজনের ফেসবুক পোস্টে করা লেখকের কয়েকটি কমেন্টের সমন্বিত রূপ এই বিশ্লেষণটি। লেখাটি সাজিয়েছেন টুডেনিউজবিডিডটনেটের সিনিয়র সহ-সম্পাদক আহমেদ নিঝুম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top