আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং তা গতিশীল করতে হলে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের পাশাপাশি উন্নত সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে আগামী দিনে তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এগুলো হলো—
১. বৈশ্বিকভাবে সৃষ্ট বাণিজ্য উত্তেজনা,
২. ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফলে চলমান ও ভবিষ্যতে সৃষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি, এবং
৩. মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহে বাধা ও জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করা কঠিন হবে এবং প্রত্যাশিত হারে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে, তখন তা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া জরুরি।
বর্তমানে ডলারের প্রবাহ বৃদ্ধি, আমদানি পণ্যের দাম হ্রাস এবং মুদ্রানীতি কঠোর করার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব এখনও স্বস্তিদায়ক নয়। চাল, তেল, মাছ ও ফলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী, যা ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থাৎ সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচক ইতিবাচক থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে এর সুফল পৌঁছায়নি।
প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর দশককেও উল্লেখ করা হয়েছে। খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান হার ও কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করছে। সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাওয়া এবং ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণ বেড়েছে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করছে। অথচ অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতই হলো অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ঝুঁকি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই বহুমুখী চাপের মধ্যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন সংকট সৃষ্টি করলে তা মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
পরিতাপের বিষয়, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির পুরোনো নজির রয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এমন কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির বিলাসিতা করার সুযোগ নেই। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পূর্বশর্ত হলো স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে কোনো অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। দেশের সকল রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বকে দলমতনির্বিশেষে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তরিক ভূমিকা পালন করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।




