জামায়াত, হেফাজত, কওমি, চরমোনাই,

জামায়াত-চরমোনাই ঐক্যে কওমীতে জামায়াতের প্রভাব বাড়বে

সৈয়দ শামসুল হুদা 

মাদরাসাগুলোতে এতদিন জামায়াতে ইসলামীর তেমন কোনো প্রভাব ছিল না। কিন্তু ৫ আগষ্টের পর যে নতুন ধারার রাজনীতি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম অবাক করা একটি ঘটনা হলো- জামায়াত ও চরমোনাই এর নজিরবিহীন ঐক্য। আসলে রাজনীতিতে আদর্শ বলতে কিছু নেই। এখানে শুধুই স্বার্থের খেলা। স্বার্থের কাছে আদর্শ তুচ্ছ। দীর্ঘদিনের জামায়াত ও বিএনপির ঐক্য প্রকাশ্যে ভেঙ্গে যায় ৫ আগষ্টের পর। এখানে আদর্শগত কোনো খেলা নেই। স্রেফ রাজনীতি, স্রেফ স্বার্থবাদি চিন্তা। বিএনপি থেকে সরে গিয়ে জামায়াত গভীর বন্ধুত্ব করে এমন একটি দলের সাথে যেই দলটি অহর্নিশ জামায়াতকে গালিগালাজ করতো। জামায়াতকে যারা ইসলামী দলই মনে করতো না, অথচ তাদের সাথে কী মধুর পিরিতি এখন। যেই ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এর দল বলতো- বেগানা নারীদের দিকে একবারের জায়গায় দ্বিতীয়বার তাকানো হারাম, সেই দলের প্রিয়ভাজনরা শুধু তাকানোই নয়, এখন দুইজন পুরুষের মাঝখানে এমন একজন নারীকে বসিয়ে দেয় যেই নারী বেগানা এবং বেপর্দা। ‍সুতরাং এগুলো সবই হলো রাজনৈতিক খেলা।

রাজনীতির অন্যতম একটি শ্লোগান হলো, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কোনো কথা নেই।’ উপরের ঘটনা প্রমাণ করে যে, আসলে রাজনীতিতে কে কখন কার শত্রু হয়ে দাঁড়ায়- তা আগে থেকে আঁচ করা অনেক কঠিন। একসময় বিএনপির যারা ঘনিষ্ট মিত্র ছিল, তারা এখন বিএনপির ঘোরতর শত্রু। আবার একসময় যারা বিএনপির সাথে দূরত্ব বজায় রাখতো তারা এখন বিএনপির বন্ধুতে পরিণত হচ্ছে। এটাই রাজনীতি। এখানে এমনটাই চলে। গণতান্ত্রিক রাজনীতি, পার্লামেন্টারিয়ান রাজনীতিতে এভাবেই চলে আসছে। কারণ, নির্বাচনের মাধ্যমে যে- যেই দলই করুক, এক সময় সে হয়- সরকারি দলে, না হয় বিরোধী দলে। এর বাইরে কোনো অপশন নাই। তখন এমন বন্ধুত্বের পরিবর্তন অস্বাভাবিক কিছু নয়। অস্বাভাবিক লাগে তখন, যখন এসব করার পরও কেউ কেউ বলে, ‘নেতা নয়, নীতির পরিবর্তন চাই-পীর সাহেব চরমোনাই।’ এগুলো হলো কথার কথা।

এবারের নজীরবিহীন ঐক্যে- হরিণ আর সিংহের একঘাটে পানি খাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গেছে। যে চরমোনাই আধ্যাত্মিক ধারার একটি দল, যাদের রাজনীতি দরবারকেন্দ্রিক, যারা সুফিবাদে বিশ্বাস করে, সেই চরমোনাই গভীর সম্প্রীতি তৈরি করেছে এমন একটি দলের সাথে- যারা পীরালি প্রথাকে সহ্যই করতে পারে না। যারা এসব সুফীজমকে প্রচন্ড ঘৃণা করে। পীর, দরবার এসবকে ভন্ডামি বলে আসছে সবসময়। কিন্তু ক্ষমতার নেশা উভয় দলকে একঘাটে নিয়ে এসেছে। দু দলই পিআর পিরিতিতে মাঠ গরম করছে। দেশকে নতুন করে অস্থিতিশীল করতে সামান্যতম দ্বিধাও করছে না।

এতেও কোনো সমস্যা ছিল না। রাজনীতি এভাবে বাংলাদেশে চলে আসছে। চলতে থাকুক। আমরা বৈচিত্রের মাঝে এই নজিরবিহীন ঐক্যের সৌন্দর্যকে উপভোগ করছি। পীরের দরবারে জামায়াতের কট্টর সুফীজম বিদ্বেষী নেতাদের দেখছি। আবার জামায়াতের সম্মেলনে কট্টর সুফীজমে বিশ্বাসী নেতাদের ঘনিষ্টতা দেখছি। ভালো লাগছে। এই নতুন ঐক্যের অন্যতম একটি ইস্যু হলো- যে কোনো মূল্যে বিএনপি ঠেকাও। সেটাও অসুবিধা নেই। সবাই যখন ক্ষমতার রাজনীতি করে, তখন এমনটা চাইতেই পারে। তারা তো এজন্যই রাজনীতি করে আসছে। ক্ষমতার চেয়ার না পাইলে রাজনীতি করে কী লাভ?

কিন্তু আশঙ্কার জায়গাটা হলো, জামায়াত ও চরমোনাই এর এই ঘনিষ্টতা এতদিনের কওমী দূর্গে আঘাত হানবে জামায়াত। কারণ, অসংখ্য কওমী মাদরাসার নেতৃত্বে আছে চরমোনাইপন্থী কওমী আলেম। ৫ আগষ্টের পূর্বে চরমোনাইপন্থী কোনো মাদরাসায় জামায়াতের অনুপ্রবেশ ছিল কঠোরভাবে হারাম এবং নিষিদ্ধ। আর এখন যেহেতু পীর সাহেব নিজেই জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সাথে মাখামাখি, সেই সুযোগে দেশের চরমোনাইপন্থী আলেমদের দ্বারা পরিচালিত সকল কওমী মাদরাসায় জামায়াত বিরোধিতা এখন কার্যত নিষিদ্ধ। এখন গভীর পিরিতির সময়। এখন পূর্বে চর্চিত বাজে আলাপে ব্যস্ত থাকার সময় নেই। সামনে ক্ষমতা হাতছানি দিয়ে ডাকছে। যদিও উনাদের আবার ক্ষমতার কোনো লোভ নেই, শুধু পিআরটা হলে কয়েকটা চেয়ার পাওয়ার আশা ছাড়া। উনারাতো আবার তেমন দুনিয়া-টুনিয়া পছন্দ করেন না, হালকা একটু মুরগির রান, আর খাসির কলিজাটা হলেই হয়ে যায়। সেহেতু পিআরটা চাচ্ছেন, আর এর মাধ্যমে যা কিছু ক্ষমতার ভাগ পাওয়া যায় সেটাই চাচ্ছেন, এর বেশি কিছু না।

জামায়াতে ইসলামীর সাথে কওমী মাদরাসাগুলোর দ্বন্ধের জায়গা হলো, আদর্শিক। কওমী মাদরাসাগুলো ক্ষমতার রাজনীতি করেই না। তারা সরকারের অংশই না। সরকারে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাও তাদের নেই। যে কারণে তারা ইচ্ছে করেই সনদের মান নেয় না। সুতরাং কওমী মাদরাসার সাথে জামায়াতের দ্বন্ধটা রাজনৈতিক নয়, আদর্শিক, এটাই বলা যায়। যদিও এই বিরোধিতার সীমা মাঝে মাঝেই সীমা লংঘন করে। বা মাঝে মাঝে মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে চলে যায়, তবুও বলতে হয় – এই দ্বন্ধ সহজে মিটবে বলে মনে হয় না। হেফাজত আমীর, আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হাফিজাহুল্লাহ এর এত কঠোরতা যেমন আমরা অনেকেই মেনে নিতে পারি না, তদ্রুপ তারেক মনোয়ারের নির্দেশনা- কওমীপন্থী আলেমদের মসজিদ থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার বিষয়টিও আমাদের কষ্ট দেয়।

আদর্শিক দ্বন্ধটা আলোচনার মধ্যেই সীমিত থাকুক, তাত্ত্বিক পর্যায়েই থাকুক এটাই আমরা চাই। কোনো প্রকার সংঘাত, মারামারি পর্যায়ে পৌছুক সেটা পছন্দ করি না। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. বুখারী শরীফের অনুবাদ গ্রন্থে মাওলানা মওদুদী রহ. এর বিভিন্ন বিষয়ের কঠোর সমালোচনা করেছেন। আবার চারদলীয় ঐক্যজোটের সরকারে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের সাথে একসাথে মঞ্চে উঠতে কোনো ধরনের সঙ্কোচবোধ করেননি। বিরোধিতাও লাগামহীন করেননি, আবার মাখামাখিও লাগামহীন করেননি। অথচ আমরা দেখতে পাই- যারা লাগামহীন বিরোধীতা করতো, তারাই এখন লাগামহীন মাখামাখি করছে। এটাই হলো ভয়ের জায়গা।

কওমী মাদরাসাগুলোতে এখন জামায়াতের আনাগোনা বাড়বে, ছাত্র শিবিরের আনাগোনা বাড়বে। কারণ, চরমোনাই এর মতো বিশাল একটি দল তাদের এখন স্পেস দিবে। ভবিষ্যত রাজনৈতিক স্বার্থে তারা এখন নিরব থাকবে। একে অপরকে তৃণমূলে আপ্যায়ন করবে। পরস্পরের আতিথ্য বরণ করবে। এতে আমার মনে হয়, একসময় চরমোনাই -ই আদর্শিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে, যদিও তারা এটা এখন অনুভব করছে না। কওমী মাদরাসা যে নীতির ওপর এতদিন চলে আসছে তাও হুমকির মধ্যে পড়বে।

লেখক : আলেম ও অনুচিন্তক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top