সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ কৌশল ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নাটকীয় পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষত ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলো পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধের চেহারা কেমন হবে, সে বিষয়ে একরকম পূর্বাভাস দিচ্ছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে, ইরান নিজেদের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো পুনর্গঠনের দিকে যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়—বরং এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ।
১২ দিনব্যাপী এক সাম্প্রতিক ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ পর্বে দেখা গেছে, ইরান ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কিছু জাহাজ বারবার জিপিএস সিগন্যাল ব্যাহত হওয়ার সমস্যায় পড়েছে। এই ঘটনায় ইরানের জন্য জিপিএসনির্ভরতা একটি দুর্বলতার চেহারা ধারণ করে। ফলত, যুদ্ধ শেষ হতেই ইরান বিকল্প প্রযুক্তির খোঁজে নেমেছে।
ইরানের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপমন্ত্রী এহসান চিতসাজ জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় এক বিবৃতিতে জানান, “মাঝে মাঝে অভ্যন্তরীণ সিস্টেমের কারণে জিপিএসে ব্যাঘাত ঘটে, যা আমাদের বেইডু সিস্টেমের মতো বিকল্পগুলোর দিকে নিয়ে যায়।” তিনি আরও জানান, সরকার এখন পরিবহন, কৃষি এবং ইন্টারনেট খাতে চীনের বেইডু স্যাটেলাইট সিস্টেমে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে।
এই পদক্ষেপ প্রাথমিকভাবে একটি কৌশলগত বিকল্প মনে হলেও, বাস্তবে এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করে। বিগত কয়েক দশকে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেম, ইন্টারনেট, উপগ্রহ এবং যোগাযোগ অবকাঠামোয় একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে, বহু দেশ একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তি কাঠামোর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে—যার কোনো বাস্তব বিকল্প ছিল না। এই নির্ভরতা একসময় দুর্বলতার রূপ নিয়েছে।
২০১৩ সাল থেকে বিভিন্ন ফাঁস ও সাংবাদিক তদন্তে উঠে এসেছে—পশ্চিমা প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী নজরদারি, তথ্য চুরি এবং গোয়েন্দা তৎপরতার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ইরান যখন বেইডু গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেটি বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্য একটি বার্তা হয়ে ওঠে—অন্ধভাবে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত অবকাঠামোর উপর নির্ভরতার যুগ শেষের পথে।
এখানে শুধু নেভিগেশন সিস্টেম নয়, বৃহত্তর ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। ইউরোপের গ্যালিলিও এবং রাশিয়ার গ্লোনাসের মতো বিকল্প ব্যবস্থাগুলোর পেছনেও একই উদ্বেগ কাজ করছে: একটি বহুমুখী, সার্বভৌম এবং নিরপেক্ষ প্রযুক্তিগত ভিত্তি নির্মাণ।
তবে ইরানের দুর্বলতা কেবল জিপিএসেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সাম্প্রতিক হামলায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনী পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের শনাক্ত করে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে। এর মাধ্যমে মোবাইল ফোন হ্যাকিং, যোগাযোগ নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ এবং ব্যক্তিগত ডেটা ট্র্যাকিংয়ের শঙ্কা বহুগুণে বেড়েছে।
১৭ জুন, যুদ্ধ চলাকালীন ইরানি সরকার জনগণকে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারে বিরত থাকতে এবং অ্যাপটি ফোন থেকে মুছে ফেলতে আহ্বান জানায়। কারণ হিসেবে বলা হয়, অ্যাপটি ব্যবহারকারীর তথ্য ইসরাইলে পাঠায়। যদিও এসব অভিযোগ সরাসরি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত কিনা তা স্পষ্ট নয়, মেটার মালিকানাধীন অ্যাপগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরাইল গাজায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করছে, তার তথ্য উৎসের বড় অংশই সোশ্যাল মিডিয়া। একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রও সরকারি ডিভাইসে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পদক্ষেপ নেয়।
ফলে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ পশ্চিমা প্রযুক্তি আসলে আর প্রযুক্তি সীমায় আটকে নেই; বরং তা এক বৃহৎ ডিজিটাল গোয়েন্দা যুদ্ধের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখে ইরান নিজের একটি অভ্যন্তরীণ জাতীয় তথ্য নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, যা সরকারের ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। ভবিষ্যতে এটি হয়তো চীনের গ্রেট ফায়ারওয়ালের মতো পরিণত হবে—যা সরকারকে দেশের ভেতরে এবং বাইরে তথ্যপ্রবাহের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেয়।
ইরান যখন পশ্চিমা প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করছে, তখন সে একটি নতুন উদীয়মান প্রযুক্তিগত বলয়ের সঙ্গে নিজেদের সারিবদ্ধ করছে—যা মূলত পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এই প্রযুক্তিগত জোট কেবল সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যারের আদানপ্রদান নয়, বরং ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি উপায় হিসেবেও আবির্ভূত হচ্ছে।
এখানে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। যদিও এটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে পরিচিত, এর লক্ষ্য হচ্ছে একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা। আর ইরান—একদিকে তার ভৌগোলিক অবস্থান, অন্যদিকে জ্বালানির জোগানদাতা হিসেবে—BRI-এর গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হয়ে উঠছে।
এইসব পরিবর্তন একটি নতুন প্রযুক্তিগত শীতল যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়—যেখানে দেশগুলো প্রযুক্তি বেছে নেয় শুধু পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক আনুগত্য এবং নিরাপত্তাজনিত আস্থার ভিত্তিতে। যত বেশি দেশ এই প্রবণতায় যোগ দেবে, ততই পশ্চিমাদের একচেটিয়া প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভাব বাস্তব সময়ে কমতে থাকবে—ফলে আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসবে।
সূত্র : আল জাজিরা




