জুলাইয়ের ঐক্য

জুলাই অভ্যুত্থানের ‘মাস্টারমাইন্ড’ থাকা লাগবে কেন

জুলাই অভ্যুত্থানের একজন ‘মাস্টারমাইন্ড’ থাকা লাগবে, এই দাবিটাই একটা হাস্যকর দাবি।

দেখেন, আমাদের সামনে আপনারা যেভাবে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি করছেন, জুলাই আন্দোলন কীভাবে হয়েছে যেন তার কিছুই আমরা জানি না। যেন-বা এর কিছুই আমরা দেখিনি। জুলাই অভ্যুত্থানের একবছর তো পুরা হয়নি এখনও, এর মাঝে একটা গোটা জাতি কি বিস্মৃত হয়ে যাবে যে—এই অভ্যুত্থান কীভাবে সংঘটিত হলো আর এটার কোনো সত্যিকার ‘মাস্টারমাইন্ড’ আছে কী না?

মাথা থেকে সমস্ত স্মৃতিকে একপাশে সরিয়ে রেখে, চলুন আমরা গতবছরের জুন আর জুলাই থেকে একটু ঘুরে আসি।
সরকারি চাকরিতে কোটার পরিমাণ কমানোর জন্য ঢাবিকেন্দ্রিক একটা আন্দোলন শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেপেলেরা যেভাবে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে সাধারণত, সেরকম চেহারারই একটা আপাত নির্বিষ আন্দোলন ছিল সেটা। আমার এখনও খেয়াল আছে, এই আন্দোলনের শুরুর পর্যায়ে ছেলেপিলেরা এই স্লোগানও দিয়েছিল যে—‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’।

যে আন্দোলনের সূচনাপর্বে বঙ্গবন্ধুর স্তুতি পাঠ হয়েছিল, একটা আজগুবি ‘মাস্টারমাইন্ড’ থিওরি টেনে সেই আন্দোলনকে খুব ক্যালকুলেটেড, খুব ডিজাইনড প্রমাণ করাটা খুবই অপরিনামদর্শী ঘটনা। ভুলটা আমাদের প্রেসসচিব শফিকুল আলম শুরু করেছেন জাতীয় পর্যায়ে। সেই ভুলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টেনে নিয়ে গিয়েছেন প্রফেসর ইউনুস বিশ্বমঞ্চে একজনকে ‘ম্যাটিকুলাস ডিজাইন’ এর নেপথ্য নায়ক বানিয়ে৷ খুবই প্যাথেটিক!

প্রসঙ্গ কথায় ফিরে আসি।
এক মুহূর্তের জন্য চলুন আমরা ধরে নিই যে—জুলাই ১৬ থেকে জুলাই ২০ এর মধ্যে শেখ হাসিনা কয়েকটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
১. কোটার পরিমাণ ৫% এ কমিয়ে আনল।
২. ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল আর পলককে পদত্যাগ করাল।
৩. ছাত্রদের নয় দফার বাকি সকল দাবিদাওয়া মেনে নিলো।
তারপর কী ঘটত?

এই টাইমফ্রেমে, আন্দোলনকারীদের দাবিদাওয়া তো এতটুকুই ছিল, তাই না? এইসবই সরকারের তরফ হতে যদি মানা হতো, তারপরের ঘটনা কী ঘটত?

শেখ হাসিনা টিকে যেত। আসিফ মাহমুদ, নাহিদ ইসলাম, সারজিস আর হাসনাত সহ সম্মুখ সারির সকল নেতারা বিসিএস পরীক্ষা দিত। আন্দোলনের প্রমিনেন্ট ফিগার হয়ে যাওয়ায়, কেউ কেউ বাড়তি পরিচিতি পেত যা তাদেরকে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে টেনে আনত, যেভাবে ২০১৮ এর কোটা আন্দোলন নুরুল হক নুরকে রাজনীতিতে টেনে এনেছে।
ঘটনা এভাবেই এগুতো। এই আন্দোলন তো কোনোভাবেই হাসিনা খেদাও আন্দোলন ছিলই না। এটা ছিল কোটাবিরোধী আন্দোলন। ফলে, এই আন্দোলনের যে একটা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিল বলে দাবি করা হয়, যিনি রূপকথার সেই জাদুকরের মতো জাদুর কাঠি অদলবদল করে ঘটনার মোড় ঘুরাতেন, সেই দাবিটা অসত্য শুধু নয়, হাস্যকরও।

কিন্তু ঘটনা সেভাবে ঘটে নাই৷ শেখ হাসিনার আকাশসম ইগো আর অনির্ণেয় দমননীতি তার পতনের চূড়ান্ত পথটাকে খুলে দেয়।

জুলাই ২০ তারিখের পর আওয়ামিলীগ ব্যাকফুটে না গিয়ে, ছাত্রজনতার উপর আরও জঘন্যভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হেলিকপ্টারযোগে হামলা, শ্যুট অন সাইট, পুলিশের আন-প্যারালাল বর্বরতা এই দেশের সমস্ত মানুষকে এক হয়ে যেতে বাধ্য করে। বিগত ১৭ বছরের অন্যায়, অনিয়ম, অত্যাচার আর নির্যাতনের ক্ষোভ তো বিশাল একটা অংশের মনে দগদগে হয়ে ছিলই, তার সাথে জুলাইয়ের ম্যাসাকার যোগ হওয়ায় তা এক অপ্রতিরোধ্য মানসিকতায় রূপ লাভ করে—হয় মরো, নয় মারো। ডু অর ডাই। মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু।

দেশের নির্যাতিত বিরোধি দলগুলো অ্যাক্টিভ হয়ে গেল ব্যানার ছাড়াই। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা মাঠে নেমে পড়ল সহপাঠী হত্যার প্রতিশোধ নিতে। চোখের সামনে পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারতে দেখে কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, চাকরিজীবী, গৃহিনী, আবাল, বৃদ্ধ, বনিতা সকলে একটা স্থির সিদ্ধান্তে চলে আসলো—নো মোর শেখ হাসিনা।

সারাদেশে বানের পানির মতো জনতা নেমে পড়ল। একদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, একদিকে ঢাকার যাত্রাবাড়ি, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, অন্যদিকে বরিশাল, চট্টগ্রাম, রংপুর সহ দেশের সকল প্রান্তে জনতার অপ্রতিরোধ্য অবরোধ—শেখ হাসিনার পতন ব্যতীত কেউ আর দ্বিতীয় কিছুই ভাবছে না তখন।

নাহিদ ইসলাম ভাই হয়ত আগষ্টের ২ বা ৩ তারিখে একদফা ঘোষণা করেছেন জাতীয়ভাবে, কিন্তু একদফার কথা, আলাপ, চর্চা তো আমরা জুলাইয়ের ২৫ তারিখ থেকে দেখা শুরু করেছি। আমি অভ্যুত্থানের নেতাদের খাটো করছি না, তবে এই একদফার দিকে না গিয়ে তাদের সামনে দ্বিতীয় কোনো রাস্তা খোলাও ছিল না।

এই রাস্তা কোনো মাস্টারমাইন্ড খুব নিবিড় ছক কষে তৈরি করেন নাই। এটা ক্যালকুলেটেড নয়। এটা প্রাইম কোনো ডিজাইন বা ম্যাটিকুলাস ডিজাইনও নয়। শেখ হাসিনার পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছিল বলে, একটা আপাত নির্বিষ আন্দোলনকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা হাসিনা পতনের আন্দোলনে রূপান্তর করেছিলেন৷

এটা সম্ভব হয়েছে বিগত ১৭ বছরে গুম হওয়া, খুন হওয়া মানুষগুলোর বাবা-মায়ের, ভাই-বোনের চোখের পানির কারণে, বুকের চাপা দীর্ঘশ্বাসের কারণে। এটা সম্ভব হয়েছে আবু সাঈদের মায়ের কান্না, ওয়াসিমের বাবার নিরীহ চোখের আর্তনাদ, শান্তর বোনের আহাজারি, আবরার ফাহাদের পিতামাতার নির্ঘুম রোনাজারির বদৌলতে৷ শত শত মায়েদের, বাবাদের, ভাই আর বোনদের আহাজারি, রোনাজারি, আর্তনাদ, ফরিয়াদ আর বদদোয়া জমা হতে হতে একদিন ঠিক ঠিক সেই মুহূর্তটা চলে আসলো।
‘নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে রেখেছেন।’ (সুরা আত তালাক, ০৩)

রেজাউল করিম রনি ভাইয়ের সুরে বলতে চাই—
‘জুলাই অভ্যুত্থানের কোনো মাস্টারমাইন্ড নেই। যদি কোনো মাস্টারমাইন্ড লাগে, সেই মাস্টারমাইন্ড হলো অভ্যুত্থানের শহিদেরা। জীবিত কেউ এর হকদার নয়।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top