রেদোয়ান হাসান
জাতিসঙ্ঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের বেশ কিছু চুম্বুকাংশ পড়লাম। তারা এই প্রতিবেদনের টাইটেল দিয়েছে “জুলাই বিক্ষোভের সময় সংঘঠিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহার।”
গতকাল জাতিসঙ্ঘের কোনো অফিস উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল না, এটা ছিল জুলাই স্মরণ অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত জুলাই যোদ্ধারা “জুলাই বিক্ষোভ” বলায় এর প্রতিবাদ করেছে, বক্তাগণ ইনিয়ে বিনিয়ে জুলাই আন্দোলন বা বিক্ষোভ বলতে চাইলেও বিপ্লবীরা বলেছেন, আমরা জুলাইকে বিপ্লব মনে করি। সুতরাং আমাদের আবেগের জায়গাকে পুনর্ব্যাখ্যা করবেন না। এটি আমাদের কাছে নিছক কোনো বিক্ষোভ কিংবা আন্দোলন নয়, এটি ছিল গণঅভ্যুত্থান, যা জুলাই বিপ্লবের সূচনা।
এই প্রতিবেদনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের টাইমফ্রেমে নানান ফ্যাক্ট তুলে ধরা হয়েছে। এই গণঅভ্যুত্থান ঘটার পেছনে অন্তর্নিহিত ফ্যাক্টগুলো তুলে আনলেও ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের সূতিকাগার ২০১৩ সালের শাপলা ফ্যাক্টকে সুকৌশলে এড়িয়ে গেছে জাতিসঙ্ঘের তথাকথিত মানবাধিকার।
আমরা এ বিষয়ে ভোকাল ছিলাম। উপদেষ্টা জনাব আদিলুর রহমানকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম যে, জাতিসংঘ যে ফ্যাক্টগুলো তুলে আনল, সেটা কি পর্যাপ্ত? এখানে আপনাকে যে অধিকার থেকে শাপলা শহীদদের তালিকা প্রকাশ করার কারণে জেলে যেতে হয়েছিল, এটা কি আলেম সমাজ, মাদরাসা শিক্ষার্থী এবং তওহিদি জনতাকে ট্রিগার্ড করেনি? আমরা কি এই গণঅভ্যুত্থানে ১৩, ২১, ২৪ সাল, আমার ভাইয়ের রক্তে লাল স্লোগান দেইনি? জুলাইকে আমরা আমাদের ইন্তিফাদা ভাবিনি? তাহলে এই ফ্যাক্টগুলো না থাকার পেছনে কারণ কী?
একই কথা আমি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ভাইকেও বলেছিলাম। প্রশ্ন ছুঁড়েছি, শাপলা গণহত্যার জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন হবে কিনা?
তাদের কথা থেকে যেই উত্তরটা এসেছে। তার সারমর্ম হলো, শাপলা গণহত্যার ট্রাইব্যুনাল গঠন হচ্ছে না। আদিলুর রহমান বললেন, হেফাজতের শহীদদের পক্ষ থেকে করা মামলাগুলোই টিকবে কিনা, আল্লাহ মালুম। কারণ, মামলার সাক্ষী ও বাদীরা আদালতে উপস্থিত হন না।
১২ বছর পর সাধারণত যে শাপলা শহীদ ভাইটির স্ত্রী বিধবা হয়েছিল, সে এখন আরেক সংসার করছে, তার ঘরে দুই তিনজন সন্তান। সে কীভাবে আগের স্বামীর জন্য আদালত চত্বরে পায়ের জুতা ক্ষয় করবেন, এই বাস্তবতা আমাদের সামনে৷
আমরা আবেদন জানিয়েছি, অন্তত একটা কমিশন করে হলেও যেন শাপলা শহীদদের জন্য কিছু একটা করা হয়। তারা আসতে না চাইলেও তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে হলেও তাদের সব কিছু ডকুমেন্টেশন করা হয়। তারা এ বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহী।
ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে বিএনপি ও জামায়াতের দীর্ঘ শোষণের ত্যাগকে স্বীকার করা হলেও অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের ত্যাগকে স্বীকার করা হয়নি। জুলাইতে আওয়ামী লীগ যে ছাত্র-জনতাকে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েছিল, সেটার কোনো সত্যতা তারা পায়নি, এমনটাই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর মিথ্যা মামলা, গুম-খুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়গুলো ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ে উঠে এসেছে।
মীর্জা ফখরুল আলমগীরও তার বক্তব্যে একই বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের প্রেক্ষিতে আমার দেশ পত্রিকার “বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের আগমনী বার্তা” শিরোনামের বরাত দিয়ে ফ্যাসিবাদের উত্থানকে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু তিনি এটাও বলেছেন যে, জুলাইকে তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ‘কারণ’ মনে করেন না।
জামায়াতের আমীর তার বক্তব্যে ২০০৯ সালের পিলখানায় ঘটে যাওয়া দেশপ্রেমিক সেনাসদস্যদের গণহত্যার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের উত্থান দেখালেও ২০১৩ সালের শাপলা গণহত্যার ব্যাপারে টু শব্দ করেননি। তবে তিনি জাতিসঙ্ঘের এই প্রতিবেদন যথেষ্ট নয় বলে দাবি করেছেন, এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন মীর্জা ফখরুল আলমগীর৷
এনসিপির আখতার হোসেন কিছু একটা বলার ছিল তাই কিছু বললেও তার কথার স্পেসিফিক কোনো মর্ম আমার উপলব্ধি হয়নি।
আসলে জুলাইকে আমরা হারাতে বসেছি। জুলাইকে আমরা পুনর্ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছি বিদেশি শক্তির কাছে, যেভাবে ৭১ কে তুলে দেয়া হয়েছিল ভারতের কাছে। জুলাইয়ের মধ্য দিয়ে আমরা যে আত্মনির্ভরশীলতার পথে হেঁটেছি, সেই জুলাইকে আমরা তুলে দিয়েছি অন্য আরেকজনের হাতে। ফলে আমরা এখন অস্তিত্বহীন লড়াইয়ের পথযাত্রী।
বলা হয়, ২০১৩ তে যে শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি দেখা গিয়েছিল, তারই বিপরীতে শাপলা কায়েম হলেও সেটা ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের ফ্যাক্ট হিসেবে চিত্রিত করা হয়নি। জাতি হিসেবে এটা আমাদের অপমানের।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত ছিল, জাতিসঙ্ঘের কার্যালয় না করে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা। যেখানে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে সভাপতি করে দলনিরপেক্ষ বিশিষ্ট নাগরিক, আলেম সমাজ, শহীদ পরিবারের সদস্য, নারী অধিকার কর্মী, সংস্কৃতিবিদ, ইতিহাসবিদ, আইনবিদ, তথ্য প্রযুক্তিবিদ, মানবাধিকার কর্মী, গণমাধ্যমকর্মীদের সমন্বয়ে এই কমিটির মডেল জাতিসঙ্ঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের মতো স্বল্পমেয়াদী নয়, বরং ট্রুথ কমিশনের মতো হবে দীর্ঘমেয়াদী।
যে গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট নিয়ে মানুষ এই গণমুখী দাবিতে রাজপথে নেমেছিল, কারণ তারা ছিল নানাভাবে জুলুমের শিকার। যখন মজলুমের রক্ত গরিয়ে এক জায়গায় যায়, তখন সেখানে আর বিভেদ থাকে না। ফলে সবাই তাদের ওপর হওয়া দীর্ঘ বঞ্চনা, ভোটাধিকার হরণ, নাগরিক মর্যাদাহীন বৈষম্য এবং গুম-খুন এবং আয়নাঘরের বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার। এ কারণে যখন মুক্তিকামী স্বাধীনতার ডাক এলো, সকলেই তাদের ওপর হওয়া জুলুমের প্রতিধ্বনি সেখানে শুনতে পেলেন। এজন্য স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তারা রাজপথে নেমেছিলেন। একটাই কারণ, তাদের উপর যা হয়েছে সেটা যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। এই স্পিরিটকে সামাজিকিকরণ করাটাই এই ট্রুথ কমিশনের প্রধান কাজ হবে।
জাতিসঙ্ঘের অধীনে মিয়ানমার, সিরিয়া বা সুদান ইস্যুতে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন চালানো হয়েছে, যা এখনও বিতর্কিত এবং অনেক জায়গায় তা অকার্যকর।
বিশ্বে সব জায়গায় স্বৈরতন্ত্রের পর জাতিসঙ্ঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন কাজ করতে দেয়া হয়নি। অনেক জায়গায় স্বাধীন ট্রুথ কমিশন কাজ করেছে। উদাহরণ আছে ভুড়ি ভুড়ি।
এসব ট্রুথ কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল, রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকারদের স্মৃতি রক্ষা, ইতিহাস লিপিবদ্ধকরণ এবং জনগণের উপর হওয়া জুলুমের যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। মূল দর্শন হলো, প্রতিশোধ নয়, বরং গণস্মৃতি ও নৈতিক ইনসাফ। প্রক্রিয়া ছিল, গণশুনানি, অভিজ্ঞতা দলিলীকরণ, ঐতিহাসিক স্মারক তৈরি এবং সর্বোপরি শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্তি।
বিকল্প আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য জাতিসঙ্ঘের অফিস নয়, বরং ওআইসি হিউম্যান রাইটস কমিশন, মালেশিয়ার সুহাকাম মডেল, সাউথ আফ্রিকান ট্রুথ কমিশন মডেল এবং ফিলিস্তিন ও তুরস্কের স্বাধীন মানবাধিকার বোর্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল দেশীয় মানবাধিকার উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করে তুলতে পারত।
এই ট্রুথ কমিশন হলে আমাদের পরনির্ভরশীলতা কমে আসত। গণঅভ্যুত্থানে যে দিল্লি না ঢাকা স্লোগান উচ্চারিত হয়েছিল, সেই ধারাবাহিকতায় আমরা অন্যের তাবিদারি বর্জন করতে পারতাম। সবার উপরে দেশের যে বাংলাদেশপন্থী আকাঙ্ক্ষা, তার ইতিহাস রক্ষা ও শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি হ্রাস ও নতুন প্রজন্মের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি চাপ ছাড়াই মানবাধিকার উন্নয়ন করতে পারতাম। যা জাতিসঙ্ঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ে অনুপস্থিত।
জাতিসঙ্ঘের এই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ে ৫ থেকে ১৫ আগস্টের টাইমফ্রেমে মাজার, মন্দির ও কাদিয়ানী গোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনা ফ্যাক্ট হিসেবে ঠাই পেলেও সেখানে পরিকল্পিতভাবে অনুপস্থিত ছিল ১৩ ও ২১ এর গণহত্যার নৃশংস জুলুমের ফ্যাক্টটি৷ কিন্তু কেন?
ড. মুহাম্মদ ইউনুস কেন এই বৈষম্য, জানতে চাই!
লেখক : আহ্বায়ক, সাধারণ আলেম সমাজ




