আইনুল হক কাসেমী
আসিফ আদনান, আবু ত্বহা আদনান, জাকারিয়া মাসুদ ভাইদের মতো জেনারেল ইসলামপন্থী সেলিব্রিটিদের ফলো করার ক্ষেত্রে আমি সবসময় একটা কথা বলি, সেটা হলো উনাদেরকে ফলো করা যাবে, তবে রয়েসয়ে। কারণ, দিনশেষে উনারা কেউই আলেম না।
আর আলেম না হলে যে যতবড় স্কলার বা সেলিব্রিটি হোন না কেন; দীনি বিষয়ে ভুল, বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতির সম্ভাবনা থাকে। এজন্য জেনারেল কাউকে ফলো করতে গিয়ে দীনি বিষয়ে কোথাও খটকা লাগলে কোয়ালিটিফুল কোনো বিজ্ঞ আলেমের স্মরণাপন্ন হওয়া উচিত।
আমার কথাটা নিছক কোনো কথা নয়; এটা দীন অনুসরণ করার এক অন্যতম মূলনীতি। কিন্তু উল্লিখিত ভাইদের ফ্যান-ফলোয়ারদের অনেকেই কথাটা হজম করতে পারেন না; তারা পোস্টে ও ইনবক্সে এসে ক্যাঁচাল করেন; বারবার আপত্তি উঠান- আলেম কাকে বলে? আলেম হতে হলে কি দাওরা পড়া লাগবেই? অমুক তমুকের মতো ক্লাসলেস বক্তা আলেম হতে পারলে এই ভাইয়েরা হতে পারবেন না কেন!
আসলে আলেম বলতে ধর্মবিশারদ বিশেষ এক শ্রেণিকেই বোঝায়। আলেম হতে হলে কুরআন, হাদিস, আকিদা, ফিকহ ইত্যাদি ইসলামি সাবজেক্ট একাডেমিকভাবে একেবারে অথেনটিক সোর্স থেকে জ্ঞানগবেষণামূলকভাবে পড়ে অভিজ্ঞ হতে হয়। এরপর উস্তাদদের থেকে ইলমের ইজাযাহ বা যোগ্যতার সম্মতি কিংবা শাহাদাহ বা সার্টিফিকেট পেতে হয়। আবহমানকাল থেকে ইলম ও উলামাদের এটাই চিরাচরিত রীতি হয়ে আসছে।
একাডেমিকভাবে অথেনটিক সোর্স থেকে জ্ঞানগবেষণামূলকভাবে পড়ার মানে হলো, কুরআনের জন্য তাফসিরের কিতাবাদি, হাদিসের শুরুহুল হাদিস, ফিকহের জন্য ফাতাওয়ার কিতাবাদি, আকিদার জন্য আকিদার কিতাবাদি মূল আরবি সোর্স থেকে উস্তাদের মাধ্যমে বুঝেশুনে পড়া আরকি। এমনকি সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রের ক্ষেত্রে সালাফ থেকে নিয়ে খালাফ পর্যন্ত আলেমদের মধ্যে কার কী অবস্থান, কার কথা কতটুকু গ্রহণযোগ্য, আপত্তি ও জবাব- এসব নির্ণয় করেই পড়া। অনূদিত বাংলা বইপত্র পড়ে কিংবা দেশি-বিদেশি কারও লেকচার শুনে দীনের কিছু জানাশোনা হয়ে গেলেই সেটা ইলম নয়; এমনকি এমন ব্যক্তি আলেমও নয়।
মাদরাসায় পড়ে যারা আলেম হয়, মৌলিকভাবে অথেনটিক সোর্স থেকে কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আকিদার কিতাব পড়েই হয়। এজন্য তাদেরকে সমাজে “আলেম” বলা হয়। হ্যাঁ, তাদের মাঝে একটা অংশ নানান কারণে খুব বেশি কোয়ালিটিফুল মানের আলেম হয় না। কিন্তু বড় অংশ যারা কোয়ালিটিফুল আলেম হয়, তারা বাস্তবেই একেকজন আলেম। হ্যাঁ, মাসলাক ও মানহাজের ক্ষেত্রে তিনি হয়তো আপনার চিন্তা থেকে ভিন্ন হতে পারেন। আবার দীনের বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ওই আলেমের এক্টিভিটি নাও থাকতে পারে। তাই বলে তাকে আপনার “আলেম” মানতে অসুবিধা কোথায়?
জেনারেল শিক্ষিত সেলিব্রিটি ইসলামন্থী যেসকল ভাইয়ের কথা বলছি, উনারা সকলেই দীনের মৌলিক জ্ঞান রাখেন। অর্থাৎ দীনের ফরজে আইন ইলম উনাদের আছে। পাশাপাশি সামসময়িক চিন্তাচেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি, মতবাদ, রাজনীতি, দর্শন, ইতিহাস, রাষ্ট্রচিন্তা, কওম ও উম্মাহ নিয়ে ভাবনা ইত্যাদি এক্সট্রা জ্ঞান ও গুণ তাদেরকে অনন্য করে তোলেছে, যা কিনা অনেক কোয়ালিটিফুল বিজ্ঞ আলেমের মাঝেও থাকে না।
তাই বলে আপনি তাদেরকে “আলেম” বানিয়ে দেবেন? দীনের এমন ফরজ ইলম তো সাধারণ অনেক মানুষেরও আছে! তাহলে কি সবাই আলেম! আলেম হতে হলে তো দীনের ফরজে আইন ইলম জানলে চলে না; ফরজে কিফায়াহ পরিমাণ ইলম দরকার হয়। যাতে সাধারণ মুসলমানদের দীনি যাবতীয় বিষয়ে সমাধান দিতে পারেন। এটার জন্য একাডেমিকভাবে পড়ে কোয়ালিটিফুল আলেম হতে হয়। কোয়ালিটিফুল আলেম না হলে একাডেমিকভাবে পড়ুয়া আলেমরাও সবকিছুর সমাধান দিতে যান না।
আচ্ছা, ডাক্তার হতে হলে কি মেডিকেলে পড়া লাগে না? কেউ যদি মেডিকেল সাইন্স নিয়ে পড়ে সার্টিফিকেট অর্জন করে, তাকে কি ডাক্তার বলা হয় না? কেউ যদি মেডিকেলে না পড়ে ব্যক্তিগত চেষ্টায় অনেক বেশি ডাক্তারি বিদ্যা হাসিল করে ফেলে, তাকে কি আপনারা ডাক্তার বলেন? যদি না হয়, তাহলে একজন ডাক্তারের চেয়েও কি আলেম হওয়াটা সস্তা? ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ডাক্তার হওয়া ব্যক্তির কাছে যদি আপনার দেহকে আপনি নিরাপদ মনে না করেন, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে কিছু দীনি জ্ঞান হাসিল করা ব্যক্তির কাছে আপনি আপনার দীনকে নিরাপদ মনে করেন কীভাবে?
শেষকথা, একজন জেনারেল শিক্ষিত সেলিব্রিটি যতই ইসলামি জ্ঞান রাখেন না কেন এবং দীনি ব্যাপারে যতই এক্টিভিটি দেখান না কেন; তাকে কখনোই “আলেম” বলা যেতে পারে না। আলেম হওয়া এত সস্তা না। খোঁজ নিয়ে দেখুন- এমন কেউ নিজেকে আলেম দাবিও করেন না। বাড়াবাড়ি সব ফ্যান-ফলোয়ারদের থেকেই হয়ে থাকে।
ইসলামপন্থী জেনারেল ভাইদের যারা দীনি এক্টিভিটিতে জড়িত, তাদেরকে “দাঈ” বলা যায়। এরচেয়ে পারফেক্ট পরিচয় আর কিছু হতে পারে বলে আমি মনে করি না। একজন দাঈ ও আলেমের মাঝে আকাশপাতাল তফাৎ। দীনের ফরজে আইন পরিমাণ ইলম নিয়ে দাওয়াহর কাজ করা যায়। দুনিয়াতে মুসলিম দাঈরা এভাবেই করে যাচ্ছেন।




