এআর ফারুকি
সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, পূর্ব তিমুর, ফিলিপাইন ও লাতিনের দেশ পেরুতে জেন–জি আন্দোলন হয়েছে বা শুরু হয়েছে। অনেক কন্সপিরেসি থিওরিস্ট মনে করেন এসব আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত না। এগুলোতে সিআইএ–এর মতো শক্তির হাত, আঙুল আছে। কিন্তু আসলেই কি তাই?
সেই আলাপে যাওয়ার আগে বলে নেই—শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের আন্দোলন সফল। বাংলাদেশেও ২০২৪ সালের আন্দোলন এক বিবেচনায় সফল।
বাকি আন্দোলনগুলো চলতি বছরেই হয়েছে বা এখনো হচ্ছে। নেপালে সরকার পতন হয়েছে এ মাসেই। ইন্দোনেশিয়ার আন্দোলন আপাতত ফল শূন্য। পূর্ব তিমুরের আন্দোলন কিছুটা হলেও সফল। তবে, ফিলিপাইন ও পেরুতে আন্দোলন শুরু হয়েছে দুই একদিনের মধ্যে। ফলে গন্তব্য এখনো বোঝা যাচ্ছে না।
কিন্তু এসব দেশের সবগুলোতেই আন্দোলনের কারণ সেম। ঘুণে খাওয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থা, দুর্নীতি, নেতাদের স্বজনপ্রীতি, বেকারত্ব ইত্যাদি কমন প্রবলেম।
এখন প্রশ্ন হইলো, অনেকেই সিআইএ–এর সত্তর, আশি এমনকি নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন দেশে সরকার পতনের কপিবুক স্টাইলের আলাপ ধরে বলতে চান, এসব আন্দোলন মূলত পশ্চিমা, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার ফল। আসলেই কী তাই? মোটেও না।
কনস্পিরেসি থিওরিস্টরা ভুলে যান গ্রাউন্ডে যে বাস্তবতা আছে, সেটা কোনোভাবেই অস্বীকার করার না। যেকোনো দেশের মানুষ এইটার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবে।
আজকের দুনিয়ায় জেন–জি প্রজন্মের একটা বড় সুবিধা হলো, তারা দুনিয়ার সঙ্গে কানেক্টেড। তারা জানে বিশ্বের কোথায় কি হয়, কোন রাষ্ট্র কীভাবে চলে, কোন দেশের জীবনযাপন কেমন সবই তাদের নখদর্পণে। ফলে, তারা যখন নিজ দেশে নিজেদের বঞ্চিত হতে দেখে সেখানে বিদ্রোহ করাটা খুবই স্বাভাবিক।
যেহেতু শ্রীলঙ্কায় একটা উদাহরণ তৈরি করেছে। পরে বছর দুয়েকের বিরতিতে বাংলাদেশ আরেকটা নজির তৈরি করেছে—সেটা স্বাভাবিকভাবেই বাকিদের উৎসাহিত করেছে। করে এবং করবে। যেমনটা আরব বসন্তের সময় হয়েছিল। এইটা নিয়া আলা বাদিউ–এর আলাপ আছে। বিপ্লব বা অভ্যুত্থান কীভাবে হয়, কেন হয় সেখানে পাবেন। তাই বিস্তারিত আলাপে যাওয়ার দরকার নাই।
তৃতীয় বিশ্বসহ দুনিয়ার যেকোনো রাষ্ট্রই একটা জটিল নেক্সাসের ওপর দাঁড়িয়ে। আসলে আমরা যে সার্বভৌমত্বের আলাপ করি সেটাকে কেবলই লোক দেখানো। দুনিয়ার প্রত্যেক রাষ্ট্রই অনেকগুলো ইন্টারেস্ট গ্রুপের নেক্সাসের সমন্বয়ে চলে। বাংলাদেশ বা নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কা কিংবা পূর্ব তিমুর এই নেক্সাসের বাইরে না।
ফলে কোনো দেশে গণঅভ্যুত্থান বা আন্দোলনে সরকার পতন হলেই সেখানে সিআইএ বা কারো না কারো হাত থাকবে এই চিন্তা খেলো। তবে হ্যাঁ, আন্দোলনের কোনো এক পর্যায়ে বিভিন্ন ইন্টারেস্ট গ্রুপের জড়িত হওয়া মোটেও নতুন কিছু না। যেমনটা হয়েছে ইউক্রেনে কালার রেভিউলিউশনের সময়। কিন্তু পুরো খেলাটা সিআইএ বা কোনো সুপার পাওয়ারের, এইটা একেবারেই বাজে ভাবনা।
কারণ, এস্পিওনাজ এমন দুনিয়া যেখানে দুর্ভেদ্য, অভেদ্য বা নিশ্ছিদ্র বলে কিছু নাই। যেমন ধরেন, বাংলাদেশে যখন রেজিম চেঞ্জ আন্দোলন হচ্ছিল তখন যদি শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এইটার মাস্টারমাইন্ড হইতো, তাইলে ভারত কি আঙুল চুষেছে! কিংবা চাইনিজরা! না। ফলে, বাংলাদেশে আন্দোলন কারো ফর্মুলায় হয়েছে এইটা একটু বাড়াবাড়ি ভাবনা। একই কথা বাকি দেশগুলোর জন্যও প্রযোজ্য।
এসব দেশে আন্দোলন অন্যের অঙ্গুলি নির্দেশে হয়েছে, এইটা বলা মানুষের জনগণের এসপাইরেশনকে অপমান করা। নাই করে দেওয়া। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করা।




