মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের উপর শুল্ক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত জারি করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে ভারত রাশিয়ার তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য মূলত রাশিয়ার উপর চাপ বৃদ্ধি করা, যাতে ইউক্রেনের সংকটের সমাধান বেরিয়ে আসে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ ইতোমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতি ও ইউরোপের নিরাপত্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।
রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য তেল রপ্তানি একটি প্রধান সম্পদ হিসেবে রয়ে গেছে, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ যার মূল্য ছিল আনুমানিক ১৯২ বিলিয়ন ডলার। তাই ট্রাম্প রাশিয়ার উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছেন এবং ভারতের মতো তেল আমদানিকারীদেরও শাস্তি দিচ্ছেন। এই সময়ে মার্কিন-রাশিয়ান আলোচনা ইউক্রেন সংকট নিরসনের জন্য চলছে।
ট্রাম্প পূর্বে রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল আমদানিকারী দেশগুলোকে সতর্ক করেছিলেন। সম্প্রতি মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেস্যান্টও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে চীনের সঙ্গে আলোচনায় রাশিয়ান ও ইরানি তেল আমদানি বন্ধ করার দাবি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
ট্রাম্পের ঘোষণার কয়েকদিন পরই ভারত প্রতিক্রিয়ায় জানায় যে তারা আমেরিকান অস্ত্র ও বিমান কেনার পরিকল্পনা স্থগিত করবে। তবে ভারতের জন্য এটি সহজ নয়, কারণ দেশটির প্রতিরক্ষা খাত মার্কিন প্রযুক্তির উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার দিকেও ঝোঁকা কঠিন, কারণ দেশটি ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার শিকার। অন্যদিকে চীনের দিকে ঝুঁকতে ভারতের জন্য আরও জটিল, বিশেষ করে ১৯৬২ সালের যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ভারত চীনের প্রতিবেশী হওয়ায় এ সম্পর্কের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমানে পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমেরিকার ১৫টি বৃহত্তম অংশীদারের মধ্যে ভারতের অবস্থান নবম।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৭৮.৩৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৫৬.৩ বিলিয়ন ডলার ছিল ভারতীয় রপ্তানি এবং ২২ বিলিয়ন ডলার ছিল আমেরিকান আমদানি। ফলে ভারতের পক্ষে ৩৪.২ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত তৈরি হয়।
২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের মূল্য ছিল ১২৮.৮ বিলিয়ন ডলার, যেখানে ভারতের উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৪৫.৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালে পণ্য ও পরিষেবার বাণিজ্যের আনুমানিক পরিমাণ ছিল ১৮৯.৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ভারতীয় রপ্তানি ছিল ১২০ বিলিয়ন ডলার এবং আমেরিকান আমদানি ছিল ৬৯.৯ বিলিয়ন ডলার। পরিষেবার ক্ষেত্রেও ভারতের উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।
তবে এসব সংখ্যার বাইরে ভারতের সিলিকন ভ্যালি প্রকল্প এবং সফ্টওয়্যার পরিষেবা খাত অনেকাংশেই আমেরিকান বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল। ফলে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানি
ওয়াশিংটনভিত্তিক এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারত রাশিয়ান তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক। এ সময়ে ভারত রাশিয়ার মোট রপ্তানির প্রায় ৩৭ শতাংশ পেয়েছে। একই সময়ে রাশিয়ান কয়লা আমদানিতেও ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল, যা মোট রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশ।
রাশিয়ান ও ইরানি তেলের কম দামে বিক্রির কৌশলকে ভারত ‘সস্তা তেল কৌশল’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজার ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মূল্যের পার্থক্য ব্যবহার করে ভারত উৎপাদন খরচ কমাচ্ছে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করছে।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত–মার্কিন সম্পর্ক শুধুমাত্র সংখ্যাগত পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যায় না। এটি স্বার্থের জটিল হিসাব। গত চার দশকে ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাতে।
বাণিজ্যিক বিবেচনায় ভারত হয়তো রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল আমদানি প্রত্যাখ্যান করে মার্কিন বাণিজ্য অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে পারে, যার বার্ষিক মূল্য প্রায় ১৯০ বিলিয়ন ডলার। তবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সাথে সহাবস্থানও সম্ভব, কারণ তার শুল্ক নীতিগুলো শুধু ভারতের জন্য নয়, অন্য দেশগুলির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
যদি ভারত রাশিয়ান তেল আমদানি চালিয়ে যায়, তবে মার্কিন শুল্ক আরোপে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য হ্রাস পেতে পারে। এতে ভারতের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যদি না বিকল্প বাজার খুঁজে পাওয়া যায়।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলে ভারত শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি করতে পারে এবং পুনরায় স্বাভাবিক বাণিজ্যে ফিরে আসতে সক্ষম হবে। ২০২৪ সালে ভারতের মোট রপ্তানির ২০ শতাংশ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যা একটি বিশাল বাজার। তাই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য শূন্যে নেমে আসবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বরং শুল্কের বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে একটি সাময়িক সমস্যা হিসেবেই থেকে যাবে এবং সংকটে রূপ নেবে না।
সূত্র : আল জাজিরা




