ট্রাম্প, নেতানিয়াহু, সিরিয়া, ইসরাইল, দ্রুজ, আরব বিশ্ব

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সিরিয়া নীতি ও মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠনের প্রজেক্ট

২০১১ সালে সিরিয়ার বিপ্লব শুরুর পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল একযোগে, কখনো আলাদাভাবে সিরিয়ায় নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এই দুই দেশের পৃথক এজেন্ডার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বড় পরিকল্পনা। সেটি হলো সিরিয়াকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দুর্বল করা এবং এই কথা নিশ্চিত করা যে কোনো আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক শক্তি যেন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরাইলি শৃঙ্খলাকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে।

ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদী বিভাজন নীতি

ইসরাইল বহু আগে থেকেই আরব বিশ্বের অভ্যন্তরে বিভাজনের কৌশল নিয়ে কাজ করছে। ১৯৫০-এর দশকে ইসরাইলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ যে নথি তৈরি করে, সেখানে কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আরব জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করার পরিকল্পনা দেখা যায়। এই ধারণা ১৯৮২ সালের বিখ্যাত ‘ইয়িনন পরিকল্পনা’-তে পূর্ণ রূপ পায়। সেখানে সিরিয়াকে ধর্মীয় ও জাতিগত সত্তায় ভাগ করে ছোট ছোট রাজ্যে পরিণত করার কৌশল নির্ধারণ করা হয়।

সিরিয়ার ক্ষেত্রে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চারটি ধাপ দেখা যায়। তা হলো,
১) সুওয়াইদা কেন্দ্রীক একটি দ্রুজ রাষ্ট্র;
২) লাতাকিয়া-তারতুসে আলাউত সংখ্যালঘুদের নিয়ে একটি উপকূলীয় রাজ্য;
৩) উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় কুর্দি অঞ্চল;
৪) তুর্কি প্রভাবাধীন সুন্নি আরব বেল্ট।

এই প্রক্রিয়া ইসরাইলের সামরিক ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করবে এবং সিরিয়াকে প্রতিরোধ শক্তি থেকে বঞ্চিত করবে।

ইসরাইলি হামলা ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস

২০১৩ সাল থেকে ইসরাইল ইরান ও হিজবুল্লাহর উপস্থিতিকে অজুহাত বানিয়ে সিরিয়ায় শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে। ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর থেকে হামলার মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং সিরিয়ার সামরিক ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অস্ত্রাগার, এমনকি বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রকেও লক্ষ্য করা হয়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদের পতনের পর ইসরাইল ৪০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি সিরিয়ার ভূমি দখল করে এবং গোলান হাইটস-সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে নিরাপত্তা বলয়ে পরিণত করে।

৭ অক্টোবর পরবর্তী প্রেক্ষাপট

হামাসের ঐতিহাসিক হামলার পর ইসরাইল তার প্রতিরোধবিরোধী কৌশল আরো সম্প্রসারিত করে এবং সিরিয়াকে এই অক্ষের ঘাঁটি হিসেবে গড়ে উঠতে না দেয়ার জন্য একের পর এক হামলা চালায়। দামেস্ক, হোমস ও সুয়েদায় বোমা হামলা চালিয়ে ইসরাইল অঞ্চলে নতুন বিভাজন সৃষ্টির কৌশল চালিয়ে যায়।

আমেরিকার কৌশল : নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলার নীতি

ওয়াশিংটনের কৌশলভিত্তিক অবস্থানও কম কার্যকর নয়। তারা সিরিয়াকে সোভিয়েত প্রভাব এবং আরব জাতীয়তাবাদের ঘাঁটি হিসেবে দেখে এসেছে। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর সিরিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল আরো জোরালো হয়। ২০১১ সালে বিপ্লব শুরু হলে আমেরিকা নির্বাচিত অংশগ্রহণের কৌশল গ্রহণ করে এবং কুর্দি গোষ্ঠীসমূহকে সমর্থন করে। যাতে ইরানি ও সিরীয় সামরিক শক্তিকে দুর্বল রাখা যায়।

তবে আমেরিকার লক্ষ্য ইসরাইলের মতো সাম্প্রদায়িক বিভাজন নয়। বরং তাদের লক্ষ্য এমন একটি বিভক্ত সিরিয়া যা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী হবে না।

দ্রুজ সত্তা নিয়ে মতবিরোধ

সুয়েদা শহরে দ্রুজ সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ইসরাইলের আগ্রহকে চিহ্নিত করেছে। ইসরাইল এখানে একটি মিত্র সত্তা গঠনে আগ্রহী হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো সরাসরি এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করেনি। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, দ্রুজ রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা জর্ডান, লেবানন এমনকি ইসরাইলের অভ্যন্তরেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

তুরস্কের অবস্থান

সিরিয়ার পুনর্গঠনে তুরস্কের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। আঙ্কারা আসাদের পতনের পর কুর্দি প্রভাব প্রতিহত করাকে প্রধান নীতি করে তুলেছে। বর্তমানে তুরস্ক সিরিয়ার অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষপাতী এবং সিরিয়া বিভাজনের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।

নতুন মানচিত্রের জন্য সংগ্রাম

সিরিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বর্তমান দ্বন্দ্ব শুধু একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ নয়। বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জোট, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ ভারসাম্যের উপর প্রভাব ফেলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে একটি শাসনযোগ্য ভূখণ্ড হিসেবে রাখতে চাইলেও ইসরাইলের উদ্দেশ্য দেশটিকে স্থায়ীভাবে ভেঙে ফেলা।

এ প্রেক্ষাপটে তুরস্ক, ইরান এবং আরব শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ছাড়া বিভাজনের এই পরিকল্পনা বাস্তব হয়ে যেতে পারে, যা আরব বিশ্বের ঐক্য ও প্রতিরোধের ভিত্তিকে চিরতরে দুর্বল করে দিতে পারে।

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top