ড্রুজ সম্প্রদায়, সিরিয়ার নতুন সরকার, মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি, ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি

ড্রুজ সম্প্রদায় কারা? সিরিয়ার রাজনীতিতে কেন তারা এত গুরুত্বপূর্ণ?

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে বুধবার ইসরাইল নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। হামলার লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট ভবন, সিরিয়ার জেনারেল স্টাফ সদর দফতরসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এসব হামলার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে দাবি করেছেন, তার দেশ ‘ড্রুজ সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে বাধ্য।‘

ড্রুজ কারা?

ড্রুজরা একাদশ শতাব্দীতে জন্ম নেয়া একটি আরব ধর্মীয় গোষ্ঠী, যাদের বর্তমান সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এরা মূলত সিরিয়া, লেবানন ও ইসরাইলে বসবাস করে। দক্ষিণ সিরিয়ার গোলান হাইটসসংলগ্ন এলাকায় তাদের একটি বড় অংশ কেন্দ্রীভূত, বিশেষ করে আস-সুওয়াইদা গভর্নরেটে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে গোলান হাইটস দখল করে ইসরাইল এবং পরে ১৯৮১ সালে একতরফাভাবে অঞ্চলটি সংযুক্ত করে।

বর্তমানে গোলান হাইটসে ২০ হাজারের বেশি ড্রুজ বসবাস করছে। এরা ২৫ হাজার ইহুদি বসতি স্থাপনকারীর সাথে একই অঞ্চলে বসবাস করলেও নিজেদের এখনো সিরিয়ান বলে মনে করে এবং ইসরাইলি নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে কেবল আবাসিক পরিচয়পত্র নিয়েছে।

সুইদার সঙ্ঘর্ষ ও সিরিয়ার নতুন সরকার

বাশার আল-আসাদের পতনের পর নতুন সিরীয় প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা দেশের সকল সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে আস-সুওয়াইদা গভর্নরেটে সম্প্রতি স্থানীয় গোষ্ঠী ও সরকারের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘর্ষে প্রায় ৩০০ জন নিহত হয়েছে। সঙ্ঘর্ষের পর সিরিয়ার সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে যুদ্ধবিরতি তত্ত্বাবধান শুরু করে।

সরকারি সূত্রে জানা যায়, এই হস্তক্ষেপের আগে সিরিয়ার সেনাবাহিনী ইসরাইলের সাথে সমন্বয় করেছিল এবং ভারী অস্ত্র না আনার শর্তে একমত হয়েছিল। কিন্তু পরে এই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে ইসরাইল। এক সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ইসরাইল তার সীমান্তবর্তী দক্ষিণ সিরিয়ায় কোনো সামরিক স্থাপনা স্থাপনের অনুমতি দেবে না।

ড্রুজদের অস্ত্র ও সরকারের সাথে উত্তেজনা

সিএনএন জানিয়েছে, আস-সুওয়াইদার ড্রুজ উপদলগুলোকে নিরস্ত্রীকরণ এবং জাতীয় সেনাবাহিনীতে একীভূত করার চেষ্টা ছিল নতুন সরকারের একটি প্রধান পদক্ষেপ। কিন্তু ড্রুজরা তাদের অস্ত্র রাখার বিষয়ে অনড়, যা সরকারের সাথে উত্তেজনার মূল উৎস হয়ে দাঁড়ায়। সূত্র জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শারা এই সম্প্রদায়ের সাথে সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

ইসরাইলের হস্তক্ষেপ ও ভিন্ন সুর

নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, সিরিয়ায় ড্রুজদের রক্ষা করতে ইসরাইল বাধ্য, বিশেষ করে এ কারণে যে উত্তর ইসরাইলের কারমেল ও গ্যালিলি অঞ্চলে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ড্রুজ বাস করেন। ইসরাইলের অন্যান্য সংখ্যালঘুদের তুলনায় ড্রুজ পুরুষরা ১৯৫৭ সাল থেকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত হয়ে আসছেন এবং নিরাপত্তা ও সামরিক খাতে উচ্চ পদেও রয়েছেন।

সিরিয়ায় সংঘর্ষ ঘিরে ড্রুজদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা যাচ্ছে। মঙ্গলবার আধ্যাত্মিক নেতা হিকমত আল-হিজরি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমরা একটি ব্যাপক নির্মূল যুদ্ধের মুখোমুখি হচ্ছি।‘ অথচ একই দিনে অপর একটি বিবৃতিতে ড্রুজ আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব সরকারি বাহিনীর আগমনকে স্বাগত জানিয়ে সশস্ত্র দলগুলোকে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানায়।

বৃহৎ ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদের পতনের পর থেকে ইসরাইল সিরিয়ার ভূখণ্ডে হামলা জোরদার করেছে এবং নতুন সরকারকে ‘চরমপন্থী ইসলামী শাসনব্যবস্থা‘ বলে আখ্যা দিয়েছে। নেতানিয়াহু ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ দিয়েছেন যাতে সিরিয়ার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা হয়, এই আশঙ্কায় যে সিরিয়া আবার ইসরাইলের বিরুদ্ধে হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন সিরিয়াকে ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে আনতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে পুনরায় একীভূত করতে আগ্রহী। ট্রাম্প প্রশাসন এমনও বলেছে, ‘সিরিয়ার ইসরাইলের দিকে ঝুঁকে পড়াই এখন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ।‘

ইসরাইলের দাবি অনুযায়ী, তারা সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছে ‘ড্রুজ সম্প্রদায়ের সুরক্ষায়‘, যারা শুধু সিরিয়ার একটি জাতিগোষ্ঠী নয়, ইসরাইলের সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা কাঠামোতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তবে বাস্তব চিত্র অনেক বেশি জটিল, যেখানে ড্রুজদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, সিরিয়ার নতুন সরকারের সাথে উত্তেজনা এবং ইসরাইলের ভূরাজনৈতিক কৌশল সব মিলিয়ে এই হস্তক্ষেপ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। ঘটনাগুলোর ভেতর থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, ড্রুজ ইস্যু কেবল একটি ধর্মীয় বা সম্প্রদায়ভিত্তিক নিরাপত্তা সমস্যা নয়। বরং এটি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির একটি কৌশলগত অনুষঙ্গ।

সূত্র : স্কাই নিউজ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top