আরিফ আজাদ
‘ড. ইউনুসকে পাঁচ বছর চাই’ মর্মে মাঝখানে একটা ভালো রকমের জোয়ার তোলা হয়েছিল অনলাইনে। খুব পপুলার টপিক। জোয়ারে তাল মিলালেই প্রচুর লাইক, কমেন্ট, শেয়ার পাওয়া যেত নিশ্চিতভাবে। আমি খুব সচেতনভাবে সেই জোয়ারে গা ভাসাইনি।
বিনিয়োগ বোর্ডের আশিক চৌধুরি, নিঃসন্দেহে অত্যন্ত যোগ্য একজন মানুষ। বৈদেশিক বিনিয়োগ নিয়ে তার একটা প্রেজেন্টেশানের পর ভার্চুয়ালে এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছিল যে—আশিক চৌধুরির এই প্রেজেন্টেশানের পর বাংলাদেশ যেন আর বাংলাদেশ নেই, সিঙ্গাপুর বা মালেশিয়া হয়ে গেছে প্রায়। আশিককে নিয়ে লিখলেই চারদিকে তখন প্রচুর হাততালি পাওয়া যাচ্ছিল।
আমি সচেতনভাবে সেই পপুলার সময়টাতেও জোয়ারে গা ভাসাইনি৷
ড. ইউনুসকে পাঁচ বছর চাওয়ার জোয়ারে গা ভাসাইনি, কারণ হলো—আমি আমার রাজনৈতিক বোঝাপড়া থেকে জানতাম যে এটা কোনোদিনও সম্ভব নয় এবং এটা সম্ভব হওয়া উচিতও নয়। একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাঁচ বছর একটা দেশের সরকারে থেকে যাওয়ার যে রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে, সেই জ্ঞানটা আমার ছিল। তা-ও আবার বাংলাদেশের মতো খুব অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের একটা দেশে এটা চিন্তা করাও তো একপ্রকার গোনাহ।
আমি আশিক চৌধুরির গুণগান গাইনি, কারণ আমি চাইনি কেবল কথার মায়ায় মুগ্ধ হতে। আমি অবশ্য জানতাম যে, ডাকঢোল পিটিয়ে, যত ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সেই বিনিয়োগ বৈঠককে বড় করে দেখানো হচ্ছিল ফলাফল তার ধারেকাছেও আসবে না। এটা কে না জানে অনির্বাচিত একটা সরকারের সময়ে দুনিয়ার কোনো বড় ব্যবসায়ী তার টাকা বিনিয়োগের মতো বোকামি করবে না। মাঝখানে ক্ষতিটা হলো আসলে আশিক চৌধুরির। তার যে যোগ্যতা আর ক্যালিবার, তাতে একটা ‘দাগ’ পড়ে গেল যে, তিনি বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ সেইভাবে আনতে পারেন নাই৷ অথচ, দোষটা কোনোভাবেই তার না—আবেগি জনতার যারা বাস্তবতার থোড়াই কেয়ার করে ঘটনাটাকে আকাশে তুলেছিল।
ড. ইউনুসের পক্ষ আমি একবারই নিয়েছিলাম। ৬ ই আগষ্ট, ২০২৪, ফযর সালাত পড়ে এসে ফেইসবুকে এক বিরাট আর্টিকেল লিখেছিলাম এই মর্মে যে—কেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিশেবে আমাদের জন্য ড. ইউনুস বেস্ট চয়েজ। এর বাইরে ড. ইউনুসের পক্ষে কোনো ওকালতি আমি করিনি। আমি এখনও আমার সেই অবস্থানকে ঠিক মনে করি। উক্ত সময়ে ড. ইউনুসের চাইতে ভালো অপশন আসলেও আমাদের সামনে ছিল না।
কিন্তু, ড. ইউনুসকে আমি আসলে খুবই স্মার্ট, ফাংশনাল, ডাইনামিক একটা সরকার হিশেবে আশা করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, ড. ইউনুস খুব বেশি কিছু না পারুন, মৌলিক কাজের একটা ধারা অন্তত দেখিয়ে দিয়ে যাবেন আমাদের, যে ধারাকে রেফারেন্স হিশেবে ধরে আমরা পরের রাজনৈতিক সরকারগুলোকে প্রশ্ন করতে পারব৷ আমরা বলতে পারব, খুব দূরের তো অতীত নয়, ২০২৪ সালের ইউনুস সরকারের আমলই তো আমাদের সামনে হাজির আছে—এই যে দেখুন জনগণের নিরাপত্তা কীভাবে তারা নিশ্চিত করেছিল, কীভাবে অপরাধের বিচার করেছিল, কীভাবে তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নজির রেখেছিল।
কিন্তু হায়, যাদের প্রাণের বিনিময়ে ড. ইউনুস আর তার সরকার পরিষদ ক্ষমতার চেয়ারে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, জুলাইয়ের সেই আহত, নিহতদের পুনর্বাসন, অপরাধীদের সঠিক বিচারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি তারা করতে পারেন নাই৷ শহিদদের একটা পূর্ণাঙ্গ তালিকা পর্যন্ত নেই।
দেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিরতা, জনজীবনের নিরাপত্তা ইত্যাদির কথা তো বাদই দিলাম৷ সেগুলো তো আমাদের সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
হ্যাঁ, আমি ড. ইউনুসকে পাঁচ বছর চাইনি। আশিক চৌধুরির স্মার্ট প্রেজেন্টেশানে আমার শখের চিড়া ভিজেনি। কারণ এই সরকারের প্রতি আমার প্রত্যাশার পারদ এতো নিঁচুতে ছিল না৷
সরি প্রফেসর।
আপনি একলা ব্যর্থ হোন নাই, আমাদেরকেও ব্যর্থ করেছেন।




