তাপপ্রবাহ, জলবায়ু,

তাপপ্রবাহ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে

আহমেদ সাঈদ

একসময় গ্রীষ্মকাল ছিল ফসল ফলানোর ও প্রাচুর্যের ঋতু। মানুষ প্রকৃতির এই ঋতুকে গ্রহণ করত আশীর্বাদ হিসেবে। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে গ্রীষ্ম আর সেই রূপ ধরে রাখতে পারেনি। আজ এই ঋতু উদ্বেগ ও আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। খরায় পুড়ে যাচ্ছে কৃষিজমি, দাবানলে ভস্মীভূত হচ্ছে বনাঞ্চল, আর শহরগুলোতে কংক্রিটের দেয়াল যেন একেকটি উত্তপ্ত চুল্লি। সূর্য যখন নিঃশব্দে মাথার উপর জ্বলে ওঠে, তখন বাতাসও থমকে যায়। এই প্রাকৃতিক উত্তাপ শুধু শরীর নয়, আত্মাকেও ক্লান্ত করে তোলে। এতে প্রশ্ন জাগে, এ কি কেবল ঋতুচক্রের একটি স্বাভাবিক রূপান্তর, না কি মানবজাতির সীমালঙ্ঘনের এক আসমানী প্রতিক্রিয়া?

ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা প্রতিকূলতা কেবল প্রাকৃতিক নিয়মের অংশ নয়, বরং আত্মজিজ্ঞাসার একটি দিকও বটে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেন, “তোমাদের উপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ, আর তিনি অনেক গুনাহ ক্ষমা করে দেন।” (সুরা শুরা : ৩০) অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা আমাদের সব ভুল ও গুনাহের হিসাব একসাথে দেন না; বরং অধিকাংশই তিনি ক্ষমা করে দেন। তবে কিছু সংকেত দেন, কিছু সতর্কতা পাঠান, যাতে মানুষ সতর্ক হয়ে ফিরে আসে এবং আত্মশুদ্ধির পথে চলতে শুরু করে। তাই কখনো কখনো তাপপ্রবাহ কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক সংকট আমাদের গাফেল, আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন হিসেবেই দেখা দেয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি হাদিসে বলেছেন, “জাহান্নাম তার প্রতিপালকের কাছে অভিযোগ করল : হে আমার রব! আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলছে। তখন আল্লাহ তাকে দুটি নিঃশ্বাসের অনুমতি দিলেন—একটি শীতকালে এবং অন্যটি গ্রীষ্মকালে। গ্রীষ্মের যে তীব্র উত্তাপ তোমরা অনুভব কর, সেটি জাহান্নামের নিঃশ্বাস।” (সহীহ বুখারি: ৩২৬০; মুসলিম: ৬১৭) এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, তাপদাহ কেবল মৌসুমের স্বাভাবিক পরিণতি নয়, বরং এটি জাহান্নামের বাস্তবতা ও আখিরাতের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এক মোক্ষম মাধ্যম। এটি ঈমানদার হৃদয়কে ভাবায়: এই সামান্য উত্তাপেই যদি সহ্য করা না যায়, তবে জাহান্নামের আগুন কেমন হবে?

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, “আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো জাতিকে শিক্ষা দিতে চান, তখন তিনি তাঁর সৃষ্টি জগতকে মাধ্যম বানান—মেঘ, বাতাস, আগুন, পানি, সূর্য সবই আল্লাহর সেনাবাহিনী।” (মাদারিজুস সালিকীন) এই কথার তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এতে বোঝা যায়, দুনিয়ার ঘটনাগুলো সবসময় বস্তুজগতের কারণ-পরিণতির ভিত্তিতে ঘটে না। কিছু কিছু ঘটনা আত্মিক ও নৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। যখন কোনো জাতি সীমালঙ্ঘনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে কঠোরতা ও সতর্কতা।

আধুনিক বিজ্ঞানও এই বিষয়ে ইসলামের মতোই একটি জবাব দেয়—তবে ভাষাগত পার্থক্যে। বিশ্বজুড়ে গবেষকরা প্রায় একবাক্যে স্বীকার করেন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণতা মানবজাতির অদূরদর্শী ও আত্মকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের ফল। শিল্প-কারখানার ধোঁয়া, বন উজাড়, জীবাশ্ম জ্বালানির অপব্যবহার এবং প্লাস্টিক দূষণ—সবকিছু মিলিয়ে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা গত শতকে বেড়েছে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (IPCC রিপোর্ট)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, প্রতিবছর গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহে বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মারা যায়। দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষত বাংলাদেশ ও ভারতে এই মৃত্যুর হার ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

এই ভয়াবহ বাস্তবতা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ আত্মিক ও নৈতিক পরিবর্তন। পবিত্র হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, “যখন তোমরা প্রকাশ্যে গুনাহ করতে শুরু করবে, তখন এমন দুর্যোগ তোমাদের ওপর আসবে যা শুধু গুনাহকারীদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না।” (তিরমিজি, হাদিস : ২১৬৮) অতএব, তাওবা করা, দোয়া ও ইস্তিগফার বাড়ানো, সমাজে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা, ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব পালনে সক্রিয় হওয়া—এসবই আমাদের করণীয়। আমাদের কাজ শুধু শরীর রক্ষা নয়, আত্মাও রক্ষা করা। কেননা আমাদের কাজের প্রতিফলন শুধু পৃথিবীতে নয়, আসমানেও প্রতিধ্বনিত হয়।

তাপপ্রবাহ কেবল একটি মৌসুম বা জলবায়ুর রূপ নয়, এটি এক আত্মিক সতর্কবার্তা। প্রকৃতি কোনোদিন প্রতিশোধ নেয় না, তবে আল্লাহর আদেশে সে মানুষকে শিক্ষা দেয়, চিন্তায় ডাকে, এবং আত্মজিজ্ঞাসায় নিমগ্ন করে। তাই এই তীব্র গ্রীষ্ম, এই উষ্ণ পৃথিবী আমাদের বলে, “হে মানুষ! থেমে যাও, ভাবো, এবং ফিরে আসো।” মহান আল্লাহর কাছে আমাদের প্রার্থনা—এই দুনিয়ার উত্তাপ যেন আমাদের অন্তরকে গলিয়ে দেয়, এবং আমরা যেন জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার উপায় খুঁজে পাই। আমিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top