সাঈদ আবরার
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও দেশীয় রাজনীতির সংকটকে বোঝার জন্য একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনা জরুরি: আমাদের সময়ের সবচেয়ে প্রকট রাজনৈতিক শক্তি কোনটি? অর্থনৈতিক অসাম্য, দুর্নীতি, স্বৈরাচার কিংবা সামরিক প্রভাব- এসব অবশ্যই বাস্তব সমস্যা। কিন্তু এগুলোর পেছনে এক অদৃশ্য কাঠামো বারবার কাজ করে যাচ্ছে, যার নাম ‘হিন্দুত্ববাদ’।
.
‘হিন্দুত্ববাদ’ শুধু একটি ধর্মীয় মতবাদ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। এর উদ্দেশ্য, ডারতীয় জাতীয়তাবাদকে হিন্দু পরিচয়ের সঙ্গে একীভূত করা এবং এই পরিচয়ের বিস্তারকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা। ফলে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির চাপে পড়ছে।
.
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর গভীরভাবে এই প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। এখানকার “সেক্যুলার প্রগতিশীলতা” মূলত ডারতের হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের সাংস্কৃতিক সংস্করণ। সংস্কৃতির আড়ালে বহু ক্ষেত্রে ডারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা চলে। বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, উদার জাতীয়তাবাদী, এমনকি বিভিন্ন সংস্কৃতিকর্মী, সবই কোনো না কোনোভাবে এই কাঠামোর কুশীলব।
.
এই প্রক্রিয়ার প্রধান রাজনৈতিক ফ্রন্ট আওয়ামী লীগ। কারণ, দলটি কেবল ডারতকেন্দ্রিক কূটনীতিই চালায় না, বরং ডারতের হিন্দুত্ববাদী কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেও বেঁধে ফেলেছে। এর সাংস্কৃতিক উইং হিসেবে তথাকথিত প্রগতিশীল মহল কাজ করছে, যারা রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে-বাইরে একইসঙ্গে প্রভাবশালী অবস্থান দখল করে আছে।
.
ফলে, আমরা দেখতে পাই, দেশের অসংখ্য আন্দোলন/সংগ্রাম শেষমেশ গৌণ ইস্যুতে ঘুরপাক খায়। কেননা মূল সমস্যা, হিন্দুত্ববাদ ও তার আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী আকাঙ্ক্ষাকে ফোকাসে আনা হয় না। দুই হাজার একুশ সালে ডোদী বিরোধী আন্দোলন ছিল হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে এ দেশে প্রথম বড় ধরনের বিদ্রোহ। আওয়ামী সরকার অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সঙ্গে এই আন্দোলন এবং এর সব প্রসঙ্গকে ধামাচাপা দিয়েছিল। কিন্তু এর আগে-পরে ডারত বিরোধী বা হিন্দুত্ববাদ বিরোধী অতোবড় আনুষ্ঠানিক প্রতিরোধ আর হয়নি।
.
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সত্যিকার অর্থে মুক্তির সন্ধান করতে হলে, হিন্দুত্ববাদকে কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মতবাদ ভেবে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এটিকে বুঝতে হবে আঞ্চলিক হেজেমনি হিসেবে, যা সংস্কৃতি, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির প্রতিটি স্তরে ছায়া বিস্তার করেছে।




