দেশপ্রেম, দেশপ্রেমের শরয়ী বিধান, ইসলামি শরীয়া,

দেশপ্রেম কি ঈমানের অঙ্গ?

মুফতি আব্দুল্লাহ বিন বশির

দেশপ্রেমের দুই সুরত। একটি সুরত তো হলো, মানুষ স্বভাবগতভাবে নিজ মাতৃভূমির প্রতি একটি টান অনুভব করে। একটি স্বভাবজাত ভালোবাসা মাতৃভূমির প্রতি মানুষের থাকে। আর দ্বিতীয় সুরত হলো, স্বভাবজাত এই ভালোবাসার বাহিরে ইচ্ছায় ও সচেতনভাবে দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা। প্রথম সুরত যেহেতু একটি ফিতরি ও স্বভাবজাত বিষয় যা মানুষের ইখতিয়ার বহির্ভূত, তাই সে সংক্রান্ত আলোচনার প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয় সুরত নিয়েই আমাদের আলোচনা, যাকে বর্তমানে “দেশপ্রেম” নামে প্রচার করা হয়। আর দেশপ্রেম বলতে এই দ্বিতীয় সুরতই মূলত উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।

ইচ্ছায় ও সচেতনভাবে দেশপ্রেমের শরয়ী বিধান

বর্তমান পৃথীবীর প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজ নাগরিকদের দেশপ্রেমের গুরুত্ব বুঝায় ও শিখায়। বিভিন্ন পদ্ধতিতে নাগরিকদের অন্তরে দেশপ্রেমের জযবাকে মজবুত ও দৃঢ় করার চেষ্টা করে থাকে। সে পদ্ধতিগুলোর একটি হলো দেশপ্রেমের দায়িত্বকে ইসলামের আলোকে তুলে ধরা। মুসলিম পরিচয় দেওয়া রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মুসলিম নাগরিকদের এটা বুঝানোর চেষ্টা করে যে, ‘দেশপ্রেম হলো ঈমানের একটি অংশ ও ইসলামেরই একটি বিধান। তাই একজন নাগরিক হিসেবেই শুধু নয় বরং দীনি ও শরয়ী দায়িত্ব থেকে প্রতিটি মুসলমানের করনীয় হলো নিজ দেশের সাথে ভালোবাসা ও মহব্বতের সম্পর্ক জুড়ে রাখা।

অথচ বাস্তবতা হলো দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরেও কুরআন ও হাদিসে এই কথার সপক্ষে কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি, যেখানে একজন মুমিনকে নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসা ও মহব্বত রাখার আদেশ করা হয়েছে। আর এটা এমন বিষয়ও নয়, যেখানে শরীয়ত মানুষকে শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা দেওয়া থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে, অথবা মুসলমানকে এ বিষয়ে খোলা ছাড় দিয়েছে যে, সে যার প্রতি এবং যে ভিত্তিতে ইচ্ছা ভালোবাসা ও ঘৃণা প্রকাশ করবে।

ভালোবাসা ও ঘৃণার শরয়ী মূলনীতি

ইসলাম সত্য দীন, যা মানুষের জন্য সর্বজনীন, পূর্ণাঙ্গ ও উপযোগী একটি জীবনব্যবস্থা। জীবনের অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে ইসলাম যেমন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দেয়, তেমনি দেশপ্রেম বিষয়েও ইসলামের রয়েছে শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা। যার খোলাসা হলো,
১। যে বিষয় দীনের অংশ অথবা দীনের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক রাখে ইসলাম সেসবের প্রতি ভালোবাসার আদেশ দেয়।
২। যে বিষয় দীনের সাথে শত্রুতা রাখে অথবা নেতিবাচক সম্পর্ক রাখে ইসলাম সেসব কিছুর সাথেই ঘৃণার ও শত্রুতার আদেশ প্রধান করে। এখন দীনের সাথে ঐ সকল বিষয়ের শত্রুতা আর ঘৃণার মাত্রা যত বেশি হবে সেসবের সাথে ঘৃণা ও দূরত্বের আদেশের মাত্রার আদেশও ততটাই বেশি হবে। আর দীনের লাভ-ক্ষতির বিবেচনা মাথায় রেখে উক্ত বিষয়ে প্রতি ঘৃণার প্রকাশ ও বিরুদ্ধাচরণ করাটাও জরুরি হয়ে পড়বে।
৩। আর যেকল বিষয়ের দীনের সাথে ইতিবাচক সম্পর্কও নেই বা নেতিবাচক সম্পর্কও নেই, সেগুলোর সাথে ভালোবাসার সম্পর্কও আবশ্যক নয় আবার ঘৃণার সম্পর্কও আবশ্যক নয়।

দেশ প্রমের দুটো মৌলিক ভিত্তি

উপরোক্ত মূলনীতির আলোকে “দেশপ্রেম”-এর বিষয়টি নিয়ে যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে,
ক. ভাষা, ভূখণ্ড বা জাতীয়তার ভিত্তিতে যে দেশগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর সাথে ইচ্ছায় ও অনুভূতির সাথে ভালোবাসা রাখার কোনো আদেশ ইসলাম দেয়নি। বরং বর্তমান পৃথিবীতে আন্তর্জাতিকভাবে দেশপ্রেমের যে মর্ম রয়েছে ভালো ও মন্দ দেশের সকল পদক্ষেপেই দেশের সাথে থাকা, অন্য দেশের বিবেচনায় সর্বাবস্থায় নিজের দেশের গুণগান ও প্রশংসা করে যাওয়া, প্রতিটি কদমে দেশের প্রতি আনুগত্য ও ওফাদারির প্রকাশ করা, তা তো স্পষ্টই আসাবাবিয়্যাত বা সাম্প্রদায়িকতার অন্তর্ভুক্ত। কুরআন ও হাদিসে যে বিষয়টিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় বলা হয়েছে। যা এই যুগে ইসলাম ও মুসলমানকে অগনিত ক্ষতি করেছে। সে সকল অগনতি ক্ষতির ফলাফলই হলো, মুসলিম উম্মাহের সামষ্ঠিক চেতনা লুণ্ঠন ও ভাঙ্গনের শিকার হয়ে নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে। এখন আর ইসলামী ভাতৃত্বের ভিত্তিতে সাহায্য ও ভালোবাসা বন্ধন গড়ে উঠে না, বরং জাতীয়তাবাদ ও জাতিসত্তাই এ ধরনের সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভৌগলিক বিভাজনের ভিত্তিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ গড়া ওঠার বর্তমান যে প্রচলন রয়েছে শরয়ী দৃষ্টিতে এমন দেশগুলোর প্রতি ভালোবাসা রাখা কোনো আবশ্যকীয় বিষয় নয়; বরং দেশপ্রেমের যে আধুনিক মর্ম সে অনুযায়ী দেশকে ভালোবাসার তো কোনো সুযোগই নেই।

এমন দেশগুলোর কোনো উন্নয়ের অংশগ্রহণ করা, এর জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করাও নিজ থেকে বৈধ নয়; বরং একমাত্র দীনের উপকার ও কল্যাণের স্বার্থেই শুধু এ ধরনের কাজের অনুমতি রয়েছে। মুসলিম ফহিকগণ মুসলিম ভূখণ্ডে বসবাসকারী অমুসলিমদের জন্য—পরিভাষায় যাকে জিম্মি বলা হয়—দীর্ঘায়ুর দোয়া করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তবে যদি তাদের দীর্ঘায়ুতে দীনের কল্যাণ ও লাভ থাকে তাহলে এমন অমুসলিমের জন্য এধরনের দোয়া করার অনুমতি রয়েছে।

“আলইখতিয়ার” গ্রন্থে রয়েছে যে
‌ولو ‌قال ‌للذمي: أطال الله بقاءك، إن نوى أنه يطيله ليسلم أو ليؤدي الجزية جاز لأنه دعاء بالإسلام، وإلا لا يجوز. (الاختيار لتعليل المختار4/165، كتاب الكراهية، فصل في مسائل مختلفة)
কেউ যদি জিম্মিকে এই কথা বলে, “আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘায়ু করুন”, আর এই কথা দ্বারা তার নিয়ত থাকে দীর্ঘায়ু পেলে সে ইসলাম গ্রহণ করবে অথবা জিযিয়া আদায় করবে, তাহলে তা জায়েয। কেননা, তা ইসলামের জন্যই দোয়া। আর যদি এই নিয়ত না থাকে তাহলে এমন কথা বলা জায়েয হবে না।

“আলমুহিতুল বুরহানী” গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে,
إذا قال لذمي: أطال الله تعالى بقاءك، ‌إن ‌كان ‌نيته أن الله تعالى يطيل بقاءه ليسلم أو يؤدي الجزية عن ذل وصغار فلا بأس به، وإن لم ينو شيئا يكره. (المحيط البرهاني 5/366، كتاب الاستحسان و الكراهية، ‌‌الفصل السابع عشر في الهدايا والضيافات)
যদি কেউ জিম্মিকে এই কথা বলে, “আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘায়ু দান করুন” আর তার নিয়ত থাকে, জিম্মি ইসলাম গ্রহণ করবে অথবা লাঞ্চিত ও ছোট হয়ে জিযিয়া আদায় করবে তাহলে এমন কথায় কোনো সমস্যা নেই। আর যদি কোনো নিয়ত না থাকে তাহলে তা মাকরুহ (নাজায়েয) হবে।

“ফাতয়াওয়ে কাজিখান”-এ এই মাসআলা লেখা হয়েছে যে,
وإذا قال للذمي أطال الله بقاءك، قالوا: إن نوى بقلبه أنه يطيل، لعله يسلم أو يؤدي الجزية عن ذل وصغار، فإنه لا بأس به، لأن هذا دعاء له إلى الإسلام أو المنفعة للمسلمين. (الفتاوى لقاضي خان 3/260، كتاب الحظر والإباحة)
মুসলিম কর্তৃক জিম্মিকে এই কথা বলা, “আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘায়ু করুন”, এই মাসআলায় ফুকাহাগণ বলেন, যদি মুসলিমের অন্তরে এই নিয়ত থাকে যে, অমুসলিমটি দীর্ঘায়ু পেলে হয়তো ইসলাম গ্রহণ করবে, অথবা লাঞ্চিত ও নীচু হয়ে জিযিয়া আদায় করবে তাহলে কোনো সমস্যা নেই। কেননা, এটা মূলত অমুসলিমের জন্য ইসলামের দিকেই আহবানের দোয়া। অথবা মুসলমানদের উপকারের দোয়া।

খ. আর যদি কোনো ভূখণ্ড ও রাষ্ট্র এমন হয়, যারা ইসলাম ও মুসলমানের রক্ষনাবেক্ষন করে। ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য নিজের সামর্থ্যগুলো ব্যবহার করে, ইসলামের শিক্ষা ও আইন অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করে তাহলে এমন ভূখণ্ড ও রাষ্টের সাথে অবশ্যই অন্তরের মহব্বত ও ভালোবাসার সম্পর্ক রাখা যাবে। কিন্তু এই ভালোবাসার ভিত্তি এই নয় যে এটা আমার দেশ ও আমার রাষ্ট্র, তাই আমার দায়িত্ব হলো এই দেশের প্রতি অন্তরে ভালোবাসা ও মহব্বত রাখা; বরং এই ভালোবাসার মূলনীতি ও ভিত্তি হলো, যেহেতু এই রাষ্ট্রটি দীনের সাহায্যকারী এবং এর মাধ্যমে ইসলাম ও তার বিধিবিধানগুলো শক্তিশালী হচ্ছে, এজন্য এমন রাষ্ট্রের সাথে ভালোবাসা রাখা আমার দায়িত্ব।

দুটি মূলনীতির মৌলিক পার্থক্য

ভালোবাসা ও মহব্বত রাখার এই দুটো ভিন্ন মূলনীতির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য হলো, আল্লাহ না করুন! যদি কখনো ইসলামের রক্ষক এই রাষ্ট্রটি এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়, যা ইসলামি শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক তখন এই রাষ্ট্রটির সাথে মহব্বত, ভালোবাসা ও ঐক্যমত আর সহযোগিতার স্থানে ঘৃণা, বিরোধিতা সম্পর্কচ্ছিন্নতা ও দূরত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাবে। এ থেকে এই বিষয়টি স্পষ্ট যে মহব্বত ও ভালোবাসার মূল কোনো ভৌগলিক সীমারেখার সাথে নয়; বরং দীনের সাথে মহব্বত ও ভালোবাসাই হলো আসল উদ্দেশ্য। আর এটাই ইসলামি শিক্ষার দাবী যে, মুসলমানদের ভালোবাসা ও মহব্বতের সম্পর্ক দীনের চাহিদা অনুযায়ী হওয়া চাই।

দেশপ্রেমের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি বক্তব্যের পর্যালোচনা

দেশপ্রেমের গুরুত্ব বুঝাতে সাধারণভাবে একটি হাদিস অনেকে বলে থাকে, দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। অর্থাৎ দেশের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের একটি অংশ। আল্লামা সাখাবি, সুয়ুতিসহ অসংখ্য মুহাদ্দিস এই বক্তব্যের কোনো ভিত্তি জানেন না বলে মন্তব্য করেছেন। আর আল্লামা শাওকানীসহ অন্যান্য অসংখ্য মুহাদ্দিস একে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে বানানো মিথ্যা ও জাল হাদিস হিসেবে আখ্যায়িত করেছন।

আল্লামা সাখাবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৯০২ হি.) এই হাদিসের ব্যাপারে জানেন না বলে মন্তব্যের পর লেখেছেন, কিন্তু এই হাদিসের বিষয়বস্তু সঠিক। কিন্তু মোল্লা আলী কারী রহিমাহুল্লাহ সাখাবির এই বক্তব্যের উপর কঠিন আপত্তি জানিয়েছেন।

লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top