সুদান যুদ্ধ, আরব আমিরাত বয়কট, প্রক্সি যুদ্ধ,

দেশে দেশে আরব আমিরাতের সামরিক হস্তক্ষেপ

সাঈদ মোহাম্মাদ আবরার 
আরব আমিরাত (UAE) গত এক দশক ধরে আফ্রিকার অস্থিতিশীল অঞ্চলে তার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপ করে আসছে। লিবিয়া এবং সুদানের গৃহযুদ্ধে আমিরাত-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এবং অস্ত্র সরবরাহের মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট অনুসারে, এসব অঞ্চলে আমিরাত যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যার মতো গুরুতর কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত।
.
ভূমধ্যসাগরীয় প্রভাব ও তেল সম্পদ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, আমিরাত ২০১১ সাল থেকে চলমান লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে খালিফা হাফতারের লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (LNA)-কে অর্থ ও অস্ত্রের যোগান দিয়েছে।
২০১৭ সালে লিবিয়ান মানবাধিকার গ্রুপগুলো সরাসরি আমিরাতকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করে, যার মধ্যে শত শত বেসামরিক নাগরিক হত্যা এবং ড্রোন আক্রমণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
.
২০২০ সালে ত্রিপোলিতে HRW-এর তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, আমিরাত-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো বন্দীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে এবং আত্মসমর্পণকারী যোদ্ধাদের নির্বিচারে হত্যা করেছে, যা সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ।
.
আমিরাত অ্যাডভান্সড মিলিটারি হার্ডওয়্যার, ড্রোন স্ট্রাইক এবং লজিস্টিক সাপোর্ট সরবরাহ করছে, যা LNA-কে শক্তিশালী করেছে। দেশটির সামরিক সহায়তা এখন ভাড়াটে বাহিনী, যেমন ওয়াগনার গ্রুপ (রাশিয়ান মিলিশিয়া) এবং স্প্যানিশ ব্ল্যাকওয়াটারের মতো বেসামরিক নিরাপত্তা ফার্ম পর্যন্ত বিস্তৃত।
.
ব্লুমবার্গের জুলাই মাসের রিপোর্ট অনুসারে, আমিরাত লিবিয়াসহ কমপক্ষে ছয়টি আফ্রিকান দেশে গোপন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে।
UN-এর অক্টোবরের অভিযোগ অনুযায়ী, আমিরাত সোমালিয়া ও লিবিয়ার মাধ্যমে সুদানের র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF)-কেও অস্ত্র সরবরাহ করেছে। সম্প্রতি লিবিয়া থেকে সুদানে ৫৭টি মিলিটারি ফ্লাইট পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
.
সুদানের গৃহযুদ্ধে আমিরাত র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF)-কে অর্থায়ন এবং অস্ত্র সরবরাহ করে দেশটির নিয়মিত বাহিনী (SAF)-এর বিরোধিতা করছে। RSF-এর বিরুদ্ধে দারফুরে গণহত্যার (জেনোসাইড) গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
.
২০২৫ সালের মার্চে সুদান সরকার আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) আমিরাতের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের অভিযোগে মামলা দায়ের করে।
মে মাসে অ্যামনেস্টির রিপোর্টে প্রমাণিত হয়, আমিরাত চীনা-নির্মিত উন্নত অস্ত্র (যেমন FH-95 ড্রোন) খারতুম এবং দারফুরে সরবরাহ করেছে, যা UN-এর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
.
RSF-এর হামলায় দারফুরের অ-আরব জাতিগুলোকে লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছে, যা বিশ বছর আগের গণহত্যার পুনরাবৃত্তি।
আমিরাত কলম্বিয়ান মার্সেনারিদের নিয়োগ করেছে, যাদের যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ রয়েছে।
.
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের অক্টোবরের রিপোর্ট অনুযায়ী, আমিরাত চীনা ড্রোন এবং ব্রিটিশ-নির্মিত সামরিক যান (যেমন Cummins ইঞ্জিনযুক্ত Nimr Ajban) সোমালিয়া ও লিবিয়ার মাধ্যমে RSF-কে পাঠাচ্ছে।
.
লিবিয়া ও সুদানের দরিদ্র মানুষগুলোর জীবন আজ আমিরাতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক লাভালাভের বলি হচ্ছে। এই চরম মানবিক সংকটে তথাকথিত উন্নত বিশ্ব তো বটেই, এমনকি মুসলিম বিশ্বেও এই হতদরিদ্র মানুষগুলোর পক্ষে কথা বলার কেউ নেই। এই আকাশের নিচে আল-ফাশের বা ত্রিপোলির নাগরিকদের জন্য আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সহায় নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top