সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের সোয়াইদা অঞ্চলে সাম্প্রতিক সহিংসতা দেশটির দ্রুজ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান, ইসরাইল এবং অধিকৃত গোলান হাইটসজুড়ে বিস্তৃত অঞ্চলের জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দ্রুজরা একটি বিশেষ অবস্থান ধারণ করে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরাইল সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর ওপর হামলার জন্য দ্রুজদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অজুহাত ব্যবহার করেছে।
দ্রুজ সম্প্রদায় কারা
দ্রুজরা মূলত আরব জাতিগোষ্ঠীর লোক, যারা ১১তম শতাব্দীতে একটি নতুন ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুসরণ শুরু করেন। তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে কিছুটা গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়। যেখানে ইসলামসহ অন্যান্য দর্শনের শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তারা একেশ্বরবাদ, পুনর্জন্ম এবং সত্যের সন্ধানে গুরুত্ব দেয়।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সম্প্রতি এক ভাষণে দ্রুজদের সিরিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং তাদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন।
এই সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক শিকড় ফাতেমি শাসক আল-হাকিম বি-আমরিল্লাহর (৯৯৬–১০২১ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনামলে গঠিত হয়। সম্প্রদায়ের নাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-দারাজির সাথে যুক্ত হলেও, দ্রুজরা সাধারণভাবে এই নাম ও বংশপরিচয় প্রত্যাখ্যান করে থাকেন। তারা এটিকে একটি প্রাথমিক এবং অপূর্ণ ধারণা হিসেবে মনে করেন।
দ্রুজ ধর্মবিশ্বাসের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে হামজা ইবনে আলী ইবনে মুহাম্মদ আল-জাওজানিকে বিবেচনা করা হয়, যিনি এর ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা করেন।
এই ধর্মীয় আহ্বান ১০১৭ থেকে ১০৪৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে শুরু হয়। এর পর থেকে সদস্যপদ কেবল জন্মসূত্রে দ্রুজদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; বাইরের কেউ এই ধর্মে প্রবেশ করতে পারে না।
দ্রুজ সম্প্রদায়ের শ্রেণিবিন্যাস
দ্রুজ সম্প্রদায় প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত। ‘উক্কাল’ হলো ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, যারা ধর্মীয় জ্ঞানের ধারক ও রক্ষক; ‘আজাবিদ’ শ্রেণির সদস্যরা শিক্ষাব্রতী; এবং ‘জুহাল’ বা সাধারণ মানুষ, যারা পার্থিব জীবনে নিমগ্ন।
তাদের উপাসনালয়কে বলা হয় ‘খালওয়াত’, যেখানে ঈদুল আজহার সময় ব্যতীত জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
দ্রুজ সম্প্রদায় কোথায় বসবাস করেন?
সিরিয়ায় দ্রুজদের বসবাস প্রধানত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আস-সোয়াইদা গভর্নরেটে এবং অধিকৃত গোলান হাইটস সংলগ্ন কুনেইত্রা গভর্নরেটে। এছাড়া তারা দামেস্কের শহরতলী জারামানায়ও বাস করেন।
ইসরাইলে দ্রুজরা মূলত দেশের উত্তরে এবং গোলান হাইটসে বসবাস করেন। লেবাননে তারা চৌফ, আলে এবং দক্ষিণের হাসবায়া জেলার পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বসবাস করে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে দ্রুজ সম্প্রদায়ের ভূমিকা
সংখ্যায় সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও দ্রুজরা প্রায়ই তাদের নিজ নিজ দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
ইসরাইলে দ্রুজ জনসংখ্যা আনুমানিক ১ লাখ ৫০ হাজার। ইসরাইলি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিপরীতে, কিছু দ্রুজ সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীতে নিয়োজিত। তাদের কেউ কেউ উচ্চ পদেও পৌঁছেছেন।
অধিকৃত গোলান হাইটসে ২০ হাজারের বেশি দ্রুজ বসবাস করেন, যারা এখনো নিজেদের সিরিয় নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন এবং সীমান্তের ওপারে তাদের আত্মীয়দের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সিরিয়ায় দ্রুজ জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।
গত ডিসেম্বর থেকে সিরিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে দ্রুজদের বিক্ষোভ ও বিরোধিতার ঘটনা বারবার তীব্র আকার ধারণ করেছে।
যদিও কিছু দ্রুজ নেতা দামেস্কের সাথে সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন, অন্যরা সরাসরি শরিয়া আইনের বিরোধিতা করেছেন। এদের মধ্যে শেখ হিকমত আল-হাজরি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আহ্বান জানান এবং সাম্প্রতিক সহিংসতার সময় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ বিশ্ব নেতাদের কাছে হস্তক্ষেপের আবেদন জানান।
তবে বহু দ্রুজ ব্যক্তিত্ব এই ধরনের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন।
এই অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী দ্রুজ রাজনীতিক ওয়ালিদ জুম্বলাট এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন যে ইসরাইল সিরিয়ার দ্রুজদের রক্ষা করে। তিনি আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করে সিরিয়ার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্র : আল জাজিরা




